সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরী গ্রামের বাসিন্দা আরিফা আক্তার একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তাঁর কর্মস্থল টাঙ্গুয়ার হাওরের পাড়ে অবস্থিত মানিকখিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যা অত্যন্ত দুর্গম একটি এলাকা। সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষ করার পর তিনি এই পেশায় যোগ দেন এবং গত তিন বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন। তাঁর স্বামী হেলাল আবেদীনও একজন শিক্ষক।

প্রতিদিন সকালে ফজরের নামাজ ও সাংসারিক কাজ শেষ করে সকাল সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে তিনি ঘর থেকে বের হন। বাড়ি থেকে উপজেলা সদরের দূরত্ব প্রায় সাত কিলোমিটার এবং সেখান থেকে আরও ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে পৌঁছাতে হয়। এই যাত্রাপথে মোটরসাইকেল এবং নৌকার সাহায্য নিতে হয়, যা শেষ করতে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। বছরের আট মাসই তাঁকে নৌকায় করে যাতায়াত করতে হয়। বর্ষাকালে হাওরের উত্তাল ঢেউ এবং ঝড়-বৃষ্টির সাথে লড়াই করে স্কুলে যেতে হয়। একবার প্রবল ঝড়ে নৌকায় পানি ঢুকে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, যা ছিল তাঁর জীবনের এক আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা।

তবে শুষ্ক মৌসুমে যাতায়াত আরও কষ্টকর হয়ে ওঠে। তখন হাওরে পানি না থাকায় মোটরসাইকেল ও ইজিবাইক ব্যবহারের পর প্রায় সাত কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে যেতে হয়। ধুলাবালি মাখা নির্জন পথে, অনেক ক্ষেত্রে সরু আলপথ দিয়ে কাঠফাটা রোদে হাঁটতে হয়, যেখানে জুতা পায়ে না নিয়ে হাতে করে বহন করতে হয়। যাতায়াতের নিয়মিত ব্যবস্থা না থাকায় তিনি ও আরও দুই সহকর্মী মিলে একটি নৌকা ভাড়া করে যাতায়াত করেন।

যাতায়াতের কষ্টের পাশাপাশি তাঁর বিদ্যালয়ের পরিবেশও অত্যন্ত শোচনীয়। প্রায় ৪০ বছর আগে নির্মিত টিন-শেডের তিনটি ঘর নিয়ে এই মানিকখিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। ১৯৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র চারজন। বিদ্যালয়ের দেয়ালে ফাটল এবং টিনের চালে অসংখ্য ফুটো থাকায় বৃষ্টির দিনে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে। এছাড়া গত ছয় মাস ধরে একমাত্র নলকূপটি বিকল হয়ে থাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং টয়লেটের অবস্থাও সন্তোষজনক নয়।

ছোটবেলায় অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রিয় শিক্ষক মতিউর রহমানের অনুপ্রেরণায় শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন আরিফা। বর্তমান জীবনের রুটিনমাফিক ব্যস্ততা এবং যৌথ পরিবারের দায়িত্ব থাকলেও তিনি তাঁর পেশায় অত্যন্ত গর্বিত। শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর গভীর মায়া এবং ভালোবাসা তাঁকে এই সব প্রতিকূলতা সয়ে যেতে সাহায্য করে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পড়াশোনায় বিশেষ সহায়তা করার চেষ্টা করেন তিনি, যাতে তারা ভবিষ্যতে নিজেদের সুন্দর জীবন গড়তে পারে।

আর্থিক টানাপোড়েন থাকলেও তিনি হতাশ নন। তবে হাওর অঞ্চলে কর্মরত শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত 'হাওর ভাতা'র বাস্তবায়ন নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। বেতন বৃদ্ধির কথা শুনে নৌকার মাঝির ভাড়া বাড়ানোর দাবি তাঁকে আরও চিন্তিত করলেও, শিক্ষার্থীদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যই এখন তাঁর জীবনের মূল প্রেরণা।