পূর্ব বাংলার একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ এবং ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্ন কীভাবে চূড়ান্ত পর্যায়ে রাষ্ট্র ও স্বাধিকারের আকাঙ্ক্ষায় রূপ নিল, তা অনুসন্ধান করা হয়েছে রোচনা মজুমদারের নতুন বইতে। প্রথমা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই বইটিতে আবুল মনসুর আহমদের জীবনকে প্রথাগত কালানুক্রমিক জীবনী হিসেবে উপস্থাপন না করে বরং তাঁর চিন্তার একটি 'ভূগোল' নির্মাণ করা হয়েছে। লেখকের লক্ষ্য ছিল ব্যক্তি আবুল মনসুরকে তাঁর সময়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করে পূর্ব বাংলার আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রক্রিয়াটি ফুটিয়ে তোলা।
বইটির মূল উপজীব্য হলো ভাষা থেকে রাষ্ট্র হয়ে ওঠার ধারাবাহিক বিবর্তন। আবুল মনসুর আহমদের কাছে ভাষা কেবল সাহিত্যিক রুচির বিষয় ছিল না, বরং এটি ছিল সামাজিক মর্যাদা, সাংস্কৃতিক ক্ষমতা এবং আত্মপরিচয়ের লড়াই। একদিকে পূর্ব বাংলার নিজস্ব সাহিত্যিক প্রকাশ এবং অন্যদিকে পশ্চিম বাংলার সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের বিপরীতে স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠার যে প্রয়োজনীয়তা, তা তাঁর চিন্তায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভেতরে ভাষা, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক কীভাবে নতুনভাবে সামনে আসে এবং দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের ফলে পূর্ব বাংলার স্বাতন্ত্র্য তৈরি হয়।
বইটিতে ইতিহাসকে কেবল ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৬৬ বা ১৯৭১-এর মতো নির্দিষ্ট কিছু তারিখের সীমাবদ্ধতায় আটকে রাখা হয়নি। বরং মানুষের ভাষা, সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা, অপমানের স্মৃতি এবং স্বাধিকারের আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে যে ইতিহাস রচিত হয়েছে, আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন তার একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। বিশেষ করে, বাঙালি মুসলমানরা কীভাবে নিজেদের পরিচয়ের ভেতরে সাংস্কৃতিক সত্তাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছিল, তা এই বইতে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। বইটির গঠনশৈলী অনেকটা নদীর স্রোতের মতো, যেখানে ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, মুসলমান সমাজের আত্মচেতনা এবং রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের বিষয়গুলো একে অপরের সাথে মিশে রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে গিয়ে শেষ হয়েছে।
রাজনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে লাহোর প্রস্তাব এবং ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে আবুল মনসুর আহমদের অবস্থান বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৫৬ সালের সংবিধান বিতর্ক এবং ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে লাহোর প্রস্তাবের ঐতিহাসিক বাস্তবায়ন হিসেবে দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি, তা কেন্দ্র ও প্রান্তের সম্পর্ক এবং ক্ষমতার বণ্টন বিষয়ে তাঁর গভীর চিন্তার পরিচয় দেয়। পাশাপাশি, বইটিতে আবুল মনসুরের সাহিত্যিক এবং রাজনৈতিক সত্তাকে আলাদা না করে বরং একে অপরের পরিপূরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাঁর উপন্যাসের ব্যঙ্গ এবং রাজনৈতিক লেখার মধ্য দিয়ে ভণ্ডামি, শ্রেণি বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের যে প্রশ্নগুলো উঠে এসেছে, তা তাঁর চিন্তার পূর্ণাঙ্গ রূপটি উন্মোচন করে।
বইটি কেবল জনপ্রিয় জীবনী নয়, বরং এটি একটি গভীর বৌদ্ধিক পাঠ। ফলে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই এমন পাঠকদের জন্য কিছু জায়গায় বাড়তি মনোযোগ ও শ্রমের প্রয়োজন হতে পারে। তবে লেখক আবুল মনসুরের চিন্তাকে বর্তমানের কোনো কৃত্রিম মতাদর্শের ছাঁচে না ফেলে তাঁর সময়ের অভিজ্ঞতা এবং বৌদ্ধিক পরিসরের ভেতর থেকেই বোঝার চেষ্টা করেছেন, যা বইটিকে একটি শক্তিশালী গবেষণাধর্মী রূপ দিয়েছে।




