ময়মনসিংহ নগরীর রামবাবু রোডে অবস্থিত ১৮৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত সিটি কলেজিয়েট স্কুল বর্তমানে এক অস্তিত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৪৩ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি, যেখানে একসময় অনেক কৃতী শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছেন, সেখানে এখন শিক্ষার্থীদের আনাগোনা নেই বললেই চলে। এমপিও (মান্থলি পে অর্ডার) সুবিধা ধরে রাখার লক্ষ্যে অনুমোদনবিহীন বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাগজপত্রে নিজস্ব শিক্ষার্থী হিসেবে দেখিয়ে বেতন উত্তোলন করছেন এই স্কুলের শিক্ষকরা।

সম্প্রতি তিন দিনে (৩, ৭ ও ১৩ সেপ্টেম্বর) বিদ্যালয়টিতে পরিদর্শনে দেখা গেছে, শ্রেণিকক্ষগুলো প্রায় শিক্ষার্থীশূন্য এবং বেঞ্চগুলোতে জমেছে ধুলোর আস্তরণ। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে উপস্থিতি কিছুটা থাকলেও অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। যেমন, ৩ সেপ্টেম্বর অষ্টম শ্রেণিতে মাত্র ৫ জন, নবম শ্রেণিতে ৬ জন এবং দশম শ্রেণিতে মাত্র ৩ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান জানান, ভর্তি হওয়ার আগে শিক্ষার্থী স্বল্পতার কথা জানতেন না তিনি এবং সহপাঠী কম থাকায় পড়াশোনায় প্রতিযোগিতার অভাব বোধ করছেন।

নীতিমালা অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতি শ্রেণিতে কমপক্ষে ৫৫ জন শিক্ষার্থী থাকা বাধ্যতামূলক। তবে সিটি কলেজিয়েট স্কুলের প্রকৃত চিত্র ভিন্ন। চলতি বছর ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত নিজস্ব শিক্ষার্থী আছে মাত্র ১২৫ জন, কিন্তু নিবন্ধনে দেখানো হয়েছে ৩৮৮ জন। একইভাবে ২০২৪ সালে ৮৫ জন শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও নিবন্ধনে ছিল ৩৯২ জন এবং ২০২৫ সালে ১২৫ জনের বিপরীতে দেখানো হয় ৩৫২ জন। এমনকি চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় ৯৮ জন অংশ নিলেও এর মধ্যে নিজস্ব শিক্ষার্থী ছিল মাত্র ১৯ জন; বাকিরা ছিল 'প্রক্সি' শিক্ষার্থী। জানা গেছে, শম্ভুগঞ্জ এলাকার মদিনানগর মডেল স্কুল ও সূর্যসেনা মডেল স্কুলের মতো অনুমতিহীন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের এখানে ভর্তি দেখানো হয় যাতে তারা এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারে। এছাড়া অনেক ক্যাডেট কোচিংয়ের শিক্ষার্থীকেও একইভাবে নিবন্ধিত করা হয়।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল মান্নান দাবি করেন, এই প্রক্সি শিক্ষার্থীদের বিষয়টি আগের প্রতিষ্ঠানপ্রধানের আমলের এবং তিনি ২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তা বন্ধ করেছেন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, পূর্বের অব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাবে উচ্চশ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। অন্যদিকে, ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, ২০১২ সালে টি আই এম বদরুদ্দৌলার প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। এছাড়া ২০০৫ সালের পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পদ নিয়ে দ্বন্দ্ব, পরিচালনা কমিটির বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং প্রায় ৮ লাখ ৮৭ হাজার টাকার আর্থিক অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটি তার সুনাম হারিয়েছে।

বিজ্ঞানের শিক্ষক শামছুন্নাহার বেগম জানান, ল্যাব এবং হাতে-কলমে শিক্ষার উপকরণ পর্যাপ্ত থাকলেও খুব কম শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস নেওয়া মানসিকভাবে কষ্টদায়ক। অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং কর্মজীবী পরিবারের প্রভাবের কারণে উপস্থিতি কম বলে তিনি মনে করেন। জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহছিনা খাতুন জানান, শিক্ষার্থী বাড়াতে শিক্ষকদের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তারা চেষ্টা করছেন। এদিকে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এনামুল হক জানান, শহরের প্রাণকেন্দ্রে হওয়া সত্ত্বেও এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তাঁর নজরে আসেনি, তবে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।