চা বানাতে গিয়ে মাইক্রোওয়েভে এক মগ পানি গরম করার সময় অনেকেই লক্ষ করেছেন—তিন মিনিট পর পানি সম্পূর্ণ স্থির থাকে, কোনো বুদবুদ দেখা যায় না। কিন্তু তাতে চা-পাতা বা চামচ ফেললেই পানি হঠাৎ গিজারের মতো ফুঁসে ওঠে। এমন ঘটনায় হাত-মুখ পুড়ে যাওয়ার বহু নজির রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) কাছেও নথিভুক্ত। আসলে সেই পানির তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি হতে পারে, অথচ তা ফুটছে না। স্কুলে পড়ানো হয়, ১০০ ডিগ্রিতে পানি ফোটে। কিন্তু এই ধারণা সর্বত্র প্রযোজ্য নয়—এটি নির্ভর করে চাপের ওপর।

তাপমাত্রা আসলে কী মাপে? আমাদের চারপাশের সব বস্তুই অসংখ্য অণু দিয়ে তৈরি, যা কখনো স্থির থাকে না। গ্যাসের অণুগুলো স্বাধীনভাবে ছুটে বেড়ায় এবং একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ করে। নাসার মতে, গ্যাসের তাপমাত্রা হলো তার অণুগুলোর গড় গতিশক্তির পরিমাপ। অর্থাৎ, গড় গতিশক্তি যত বেশি, তাপমাত্রা তত বেশি। কিন্তু কোনো একক অণুর তাপমাত্রা বলে কিছু নেই—একটি অণুর কেবল গতিবেগ থাকে। তাপমাত্রা অনেক অণুর সম্মিলিত আচরণের ফল। উদাহরণস্বরূপ, ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের এক গ্লাস পানির মধ্যেও কিছু অণু এত দ্রুত চলতে পারে যে তারা ১০০ ডিগ্রির ফুটন্ত পানির অণুকে ছাড়িয়ে যায়। এই দ্রুতগতির অণুগুলোর কারণেই ঠান্ডা দিনেও পুকুর বা ডোবার পানি ধীরে ধীরে বাষ্প হয়। তবে বাতাসে বেরিয়ে আসার পর সেই অণু আশপাশের অণুর সঙ্গে সংঘর্ষে তার অতিরিক্ত শক্তি দ্রুত হারায় এবং ঘরের তাপমাত্রার কাছাকাছি চলে আসে।

স্ফুটনাঙ্কের আসল রহস্য চাপের মধ্যে। পানিকে গরম করলে তার বাষ্পচাপ বাড়ে। যখন বাষ্পচাপ বাইরের বায়ুচাপের সমান হয়, তখন পানি ফুটতে শুরু করে। সমুদ্রপৃষ্ঠে স্বাভাবিক বায়ুচাপে এটি ঘটে ১০০ ডিগ্রিতে, কারণ ওই তাপমাত্রায় পানির বাষ্পচাপ ১ অ্যাটমসফিয়ারে পৌঁছায়। কিন্তু চাপ কমলে স্ফুটনাঙ্কও কমে। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোর লিডভিল শহর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০,২০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত, সেখানে বায়ুচাপ মাত্র ৬৮ কিলোপ্যাসকেল, ফলে পানি প্রায় ৯০ ডিগ্রিতেই ফুটে যায়। একই কারণে মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় বায়ুচাপ সমুদ্রপৃষ্ঠের এক-তৃতীয়াংশ হওয়ায় পানি প্রায় ৭০ ডিগ্রিতে ফোটে। সেদ্ধ ডিমের জন্য এই তাপমাত্রা যথেষ্ট হলেও—ডিমের সাদা অংশ জমাট বাঁধে ৬০-৬৫ ডিগ্রিতে, কুসুম ৬২-৭০ ডিগ্রিতে—সময় বেশি লাগে, কারণ পানি তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে।

চাপ বাড়ালে স্ফুটনাঙ্ক বেড়ে যায়, যা প্রেশার কুকারের মূল নীতি। প্রেশার কুকার ভেতরের বাষ্প আটকে রাখে, ফলে চাপ বেড়ে পানি ফুটতে বেশি বাষ্পচাপ প্রয়োজন হয়। নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির তথ্য অনুযায়ী, ১০ পিএসআই চাপে পানি প্রায় ১১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফোটে, আর ১৫ পিএসআই চাপে তা ১২১ ডিগ্রিতে পৌঁছায়। হাসপাতালের অটোক্লেভেও একই নীতি ব্যবহৃত হয়—১২১ থেকে ১৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের জীবাণুমুক্ত বাষ্প তৈরি করা হয়। এই উচ্চ তাপমাত্রা ব্যাকটেরিয়ার শক্ত স্পোরও ধ্বংস করতে পারে, যেমন বোটুলিজম সৃষ্টিকারী ক্লস্ট্রিডিয়াম বোটুলিনামের স্পোর, যা সাধারণ ফুটন্ত পানিতে বেঁচে থাকতে পারে।

মাইক্রোওয়েভে পানি সুপারহিট হওয়ার কারণ হলো বুদবুদ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় 'নিউক্লিয়েশন সাইট'-এর অভাব। সাধারণ পাত্রের ভেতরের ছোট আঁচড় বা ক্ষুদ্র বায়ু পকেট বুদবুদ তৈরি করতে সাহায্য করে। কিন্তু মসৃণ মগে সেই জায়গা কম থাকে, আর মাইক্রোওয়েভ পানি ভেতর থেকে উত্তপ্ত করে বলে পানি ১০০ ডিগ্রি পার হয়ে গেলেও বুদবুদ তৈরি হয় না। তখন পানি অস্থিতিশীল অবস্থায় থাকে; কোনো কিছু যোগ করলেই হঠাৎ বুদবুদ তৈরি হয়ে পানি ছিটকে পড়তে পারে। এফডিএ এ বিষয়ে সতর্ক করেছে—গরম করার আগে কফি বা চিনি মিশিয়ে নেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময় মেনে চলা নিরাপদ।

তরল পানি ১০০ ডিগ্রির বেশি গরম করা সম্ভব, কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত। প্রেশার কুকারে তা ১২১ ডিগ্রি পর্যন্ত যায়। তবে বাষ্পকে আরও বেশি গরম করা যায়—বাষ্পের কোনো স্ফুটনাঙ্ক নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫০-এর দশকে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাষ্পের তাপমাত্রা ৫৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল; পরবর্তী সুপারক্রিটিক্যাল নকশায় তা ৬১০ ডিগ্রি, এমনকি উন্নত ব্যবস্থায় ৭৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছায়। এই অত্যন্ত গরম বাষ্প টারবাইন ঘোরাতে ব্যবহৃত হয়। তবে তরল পানি ও বাষ্পের পার্থক্য প্রায় ৩৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ২১৮ অ্যাটমোসফিয়ার চাপে মুছে যায়; তখন পানি 'সুপারক্রিটিক্যাল ফ্লুইড'-এ পরিণত হয়। আর পানিকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে ভাঙতে (থার্মোলাইসিস) ২,৫০০ কেলভিনের বেশি তাপমাত্রার প্রয়োজন—তাই ১,০০০ ডিগ্রির তরল পানি বাস্তবে নেই।

মানুষ উচ্চ তাপমাত্রার শুষ্ক বাতাসে কিছু সময় বাঁচতে পারে, কারণ ঘাম বাষ্প হয়ে শরীর থেকে তাপ সরিয়ে নেয়। ১৭৭৫ সালে চিকিৎসক চার্লস ব্লাগডেন লোহার চুলায় গরম করা একটি ঘরে প্রবেশ করেন, যেখানে তাপমাত্রা ছিল ১৯৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট (প্রায় ৯২ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। পরে তাঁর সহকর্মীরা ২১০-২১১ ডিগ্রি ফারেনহাইট (প্রায় ৯৯-১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ঘরে প্রবেশ করেন; ব্যাঙ্কস সেখানে সাত মিনিট ছিলেন। আরেকটি পরীক্ষায় থার্মোমিটারের তাপমাত্রা ২৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (১২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ছিল, যেখানে ডিম ২০ মিনিটে সেদ্ধ এবং স্টেক ১৩ মিনিটে রান্না হয়ে গেলেও মানুষ অক্ষত ছিলেন। কারণ, বাতাসের তাপ পরিবাহিতা পানির তুলনায় অনেক কম—ওপেনস্ট্যাক্সের তথ্য অনুযায়ী, বাতাসের তাপ পরিবাহিতা ০.০২৩ ওয়াট/মিটার/ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর পানির ০.৬ ওয়াট/মিটার/ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ স্থির পানি বাতাসের চেয়ে প্রায় ২৬ গুণ দ্রুত তাপ পরিবহন করে, তাই ১০০ ডিগ্রির পানি পোড়ায়, কিন্তু একই তাপমাত্রার শুষ্ক বাতাস সহনীয়।

বাষ্পের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও ভয়ংকর। ১০০ ডিগ্রির বাষ্প যখন ত্বকে ঠান্ডা হয়ে পানিতে পরিণত হয়, তখন 'সুপ্ত তাপ' নামে অতিরিক্ত শক্তি ছেড়ে দেয়। হিসাব অনুযায়ী, ১ গ্রাম ১০০ ডিগ্রির বাষ্প প্রথমে পানিতে পরিণত হওয়ার সময় ২,২৫৬ জুল শক্তি ছাড়ে, এরপর সেই পানি ৩৭ ডিগ্রিতে ঠান্ডা হতে আরও ২৬৪ জুল শক্তি ছাড়ে—মোট প্রায় ২,৫২০ জুল, যা একই তাপমাত্রার এক গ্রাম পানির (প্রায় ২৬৪ জুল) তুলনায় প্রায় ১০ গুণ। তাই কেটলির মুখ থেকে বের হওয়া বাষ্প অবহেলা করা উচিত নয়।

সবশেষে বলা যায়, ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পানির কোনো চিরস্থায়ী সীমা নয়—এটি স্বাভাবিক চাপে স্ফুটনাঙ্ক মাত্র। চাপ কমলে স্ফুটনাঙ্ক কমে, চাপ বাড়ালে বাড়ে। এমনকি বুদবুদ তৈরির সুযোগ না থাকলে রান্নাঘরের মগের পানিও অল্প সময়ের জন্য ১০০ ডিগ্রির বেশি গরম থাকতে পারে। তবে বাষ্পকে আরও উত্তপ্ত করলে তাপমাত্রা ৭৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত যেতে পারে, আর ৩৭৪ ডিগ্রির ওপরে নির্দিষ্ট চাপে পানি আর তরল বা বাষ্পের পরিচয়ে থাকে না—সুপারক্রিটিক্যাল অবস্থায় চলে যায়।