গণিতের মৌলিক প্রকৃতি এবং এর রহস্যময় দিকগুলো নিয়ে শিক্ষার্থীদের কৌতূহল মেটাতে একটি বিশেষ প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফরিদপুর জিলা স্কুল এবং নাটোরের আব্দুলপুর মোশাররফ হোসেন উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠানো বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন 'গণিত ভাইয়া'।
শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন ছিল—গণিত কি মানুষের উদ্ভাবন নাকি এটি মহাবিশ্বের শুরু থেকেই বিদ্যমান ছিল এবং মানুষ কেবল তা আবিষ্কার করেছে? এই দার্শনিক প্রশ্নের উত্তরে গণিত ভাইয়া জানান, এর কোনো একক ও সর্বসম্মত উত্তর নেই। তবে তিনি একটি মধ্যপন্থা প্রস্তাব করেন। তাঁর মতে, প্রকৃতির মাঝে বিদ্যমান বিভিন্ন প্যাটার্ন ও নিয়মগুলো মানুষ আবিষ্কার করেছে, কিন্তু সেই সম্পর্কগুলোকে প্রকাশ করার জন্য যে ভাষা, প্রতীক এবং সংজ্ঞা ব্যবহার করা হয়, তা মানুষের উদ্ভাবন। উদাহরণস্বরূপ, গ্রহের উপবৃত্তাকার কক্ষপথের সম্পর্কটি আবিষ্কৃত, কিন্তু 'উপবৃত্ত' শব্দটি বা তার সমীকরণ লেখার পদ্ধতিটি মানুষের তৈরি। তিনি গণিতবিদ ইউজিন উইগনারের রচনার কথা উল্লেখ করে জানান, বিমূর্ত গণিত কীভাবে বাস্তব জগত ব্যাখ্যায় এত কার্যকর হয়, তা সত্যিই রহস্যময়।
অন্যদিকে, অসীমের (∞) বাস্তব অস্তিত্ব এবং এর বিভিন্ন স্তর নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। গণিত ভাইয়া ব্যাখ্যা করেন যে, অসীম কোনো নির্দিষ্ট বাস্তব সংখ্যা নয়, বরং এটি সীমাহীনতাকে বোঝানোর একটি গাণিতিক ধারণা। বাস্তব জীবনে আমরা অসীম দৈর্ঘ্যের কোনো বস্তু না দেখলেও, আধুনিক বিজ্ঞান ও ক্যালকুলাসের জন্য এই ধারণা অপরিহার্য। এর মাধ্যমেই বক্ররেখার ক্ষেত্রফল বা তাৎক্ষণিক গতিবেগের মতো জটিল হিসাব করা সম্ভব হয়।
সব অসীম সমান কি না—এই বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি উনিশ শতকের গণিতবিদ জর্জ ক্যান্টরের কথা উল্লেখ করেন। ক্যান্টরের 'ডায়াগোনাল আর্গুমেন্ট' প্রমাণের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে যে, সব অসীম সেটের আকার সমান নয়। তিনি প্রমাণ করেন যে, প্রাকৃতিক সংখ্যার অসীমতার তুলনায় বাস্তব সংখ্যার অসীমতা অনেক বেশি বড়। ০ থেকে ১-এর মধ্যবর্তী বাস্তব সংখ্যাগুলোকে প্রাকৃতিক সংখ্যার সাথে সম্পূর্ণভাবে জোড়া লাগানো সম্ভব নয়, যা প্রমাণ করে যে বাস্তব সংখ্যার অসীমতা অধিকতর বিস্তৃত।
সবশেষে, শিক্ষার্থীদের এই গভীর চিন্তা ও প্রশ্ন করার মানসিকতাকে উৎসাহিত করে গণিত ভাইয়া জানান, প্রশ্ন করার মধ্য দিয়েই একজন প্রকৃত গণিতবিদের যাত্রা শুরু হয়। পাশাপাশি জানানো হয় যে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতের আনন্দ ছড়িয়ে দিতে নতুন উদ্দীপনায় ফিরছে 'গণিত ইশকুল'। আগ্রহী শিক্ষার্থীরা তাদের গাণিতিক চিন্তাভাবনা ও লেখা ইমেইল বা ফেসবুকের মাধ্যমে পাঠাতে পারবেন। এই উদ্যোগটিতে সহায়তা করছে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।




