চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান পাইকারি বাণিজ্য কেন্দ্র খাতুনগঞ্জের ইতিহাস ও বর্তমানের এক দীর্ঘ পরিক্রমা উঠে এসেছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য ও গবেষণায়। এই বাজারের উত্থানের পেছনে রয়েছে ভূপ্রকৃতির পরিবর্তন এবং দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ।
খাতুনগঞ্জের ভৌগোলিক পরিবর্তনের সূচনা হয় ১৭৬২ সালের ২ এপ্রিল এক প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পের মাধ্যমে। তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান হ্যারি ভেরেলস্টের বিবরণ অনুযায়ী, প্রায় চার মিনিট স্থায়ী সেই কম্পনে চট্টগ্রামের ভূখণ্ডের আমূল পরিবর্তন ঘটে। কোথাও ভূমি ধসে পড়ে, আবার কোথাও নতুন ভূমি জেগে ওঠে। এর ফলে কর্ণফুলী নদীর গতিপথ বদলে যায় এবং নতুন নতুন খাল ও বসতি গড়ে ওঠে। গবেষক হারুন রশীর মতে, এই ভূমিকম্পের প্রভাব এবং পরবর্তী সময়ে পলি জমে চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ ও বাকলিয়ার মতো এলাকাগুলোর সৃষ্টি হয়েছে। একসময় পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল 'চাক্তাই নুল্লা' বা চাক্তাই খাল, যা বান্দরবানের থানচি ও রুমা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই জলপথের আশপাশেই ধীরে ধীরে ঘাট, গুদাম ও আড়ত গড়ে ওঠে, যা বাণিজ্যিক প্রসারে সহায়তা করে।
খাতুনগঞ্জের নামকরণের পেছনে রয়েছে এক পারিবারিক ইতিহাস। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইংরেজ কর্মচারী খান বাহাদুর শেখ মোহাম্মদ হামিদুল্লাহ খান এই এলাকায় একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন, যা শুরুতে 'হামিদুল্লাহ মিঞার বাজার' নামে পরিচিত ছিল। এই বাজারের পাশেই ছিল তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী খাতুন বিবির নিজস্ব জমি। সময়ের সাথে সাথে ওই জমিতে দোকানপাট গড়ে ওঠে এবং ব্যবসা প্রসারিত হলে পুরো এলাকাটি 'খাতুনগঞ্জ' হিসেবে পরিচিতি পায়।
ব্রিটিশ আমল পেরিয়ে পাকিস্তান আমলেও এই অঞ্চলটি বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল, যদিও তখন নিয়ন্ত্রণ ছিল মূলত অবাঙালি ব্যবসায়ীদের হাতে। স্বাধীনতার পর বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ বাঙালি ব্যবসায়ীদের হাতে চলে আসে এবং খাতুনগঞ্জ দেশের সবচেয়ে বড় ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজারে পরিণত হয়। চাল, ডাল, চিনি, তেল ও মসলার মতো নিত্যপণ্যের বিশাল বাজার এখানে গড়ে ওঠে। নব্বইয়ের দশকের আগ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীরা এখান থেকেই পণ্য সংগ্রহ করতেন। বিশেষ করে ভোজ্যতেলের বাজারে টি কে, আবুল খায়েরসহ প্রায় ১২টি স্থানীয় গ্রুপের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলত। ২০০২-০৩ অর্থবছরের তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা নিত্যপণ্যের প্রায় ৬২ শতাংশই আমদানি করেছিলেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা, যার লেনদেন হতো এই খাতুনগঞ্জে।
তবে বর্তমান সময়ে খাতুনগঞ্জের সেই পুরনো জৌলুস অনেকটাই ম্লান। গত তিন দশকে ব্যবসার ধরনে এসেছে আমূল পরিবর্তন। খোলা পণ্যের বাজার সংকুচিত হয়ে এখন মোড়কজাত পণ্যের বাজার বৃদ্ধি পেয়েছে। আমদানির বড় নিয়ন্ত্রণ এখন ঢাকাভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে। ফলে স্থানীয় অনেক বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণ খেলাপি হওয়া বা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। পণ্য আমদানি হলেও সেগুলো ঢাকায় গিয়ে মোড়কজাত হয়ে পুনরায় চট্টগ্রামে ফিরে আসার ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সুযোগ কমছে।
সাবেক চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি আমীর হুমায়ূন মাহমুদ চৌধুরীর মতে, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজধানীমুখী হওয়ায় পাইকারি বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা কমেছে, যার প্রভাব পড়ছে পণ্যের দামের ওপর। তবে এখনো দেশের পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি বুঝতে খাতুনগঞ্জের খোঁজ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এই ঐতিহাসিক বাজারটি পুনরায় তার পুরনো গুরুত্ব ফিরে পেতে পারে। বর্তমানে 이곳ের পুরোনো দালান এবং সরু সড়কের দৃশ্যগুলো কেবল অতীতের গৌরবের কথা মনে করিয়ে দেয়।




