স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত তিন বছর সময় পেল বাংলাদেশ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এক প্লেনারি মিটিংয়ে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়, যার সভাপতিত্ব করেন খলিলুর রহমান। উরুগুয়ের প্রতিনিধির উত্থাপিত একটি খসড়া প্রস্তাবে বাংলাদেশ ও নেপালের উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর কথা বলা হয়, যা ফ্রান্স, কানাডা এবং আয়ারল্যান্ডের মতো দেশগুলো সমর্থন করে। এর ফলে আগামী ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে আসবে।
জাতিসংঘ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই সময় বৃদ্ধি একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এবং এটি ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশের জন্য উদাহরণ হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। পাশাপাশি, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশ তার প্রস্তুতিতে কতটুকু এগিয়েছে, তা যাচাই করতে একটি মধ্যবর্তী মূল্যায়ন করা হবে।
এই অতিরিক্ত সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে রপ্তানিকারক ও নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় স্বস্তি বয়ে আনবে। এলডিসি উত্তরণ হয়ে গেলে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা, বিভিন্ন ভর্তুকি, নগদ সহায়তা এবং নমনীয় শর্তে বিদেশি ঋণের সুযোগ চলে যেত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) হিসাব অনুযায়ী, এই সুবিধাগুলো চলে গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বছরে প্রায় ৬৩৮ কোটি ডলার বা ২৬.৬ শতাংশ হ্রাস পেতে পারত। উত্তরণ পিছিয়ে যাওয়ায় ২০২৯ সাল পর্যন্ত এই সুবিধাসমূহ বহাল থাকবে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বড় বাজারগুলোতে উত্তরণের পর আরও তিন বছর এই সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ওষুধশিল্পের জন্যও এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে মেধাস্বত্বের কড়াকড়ি নিয়ম কার্যকর হতো, ফলে অনেক ওষুধের জন্য পেটেন্ট লাইসেন্স নিতে হতো, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিত। বর্তমানে দেশের প্রায় ২০ শতাংশ ওষুধ এই বিশেষ সুবিধার আওতায় তৈরি হয়, যা আগামী তিন বছর অব্যাহত থাকবে।
তবে এই স্বস্তির পাশাপাশি সংস্কারের তীব্র চাপ রয়েছে। জাতিসংঘ এবং অর্থনীতিবিদরা আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, কর রাজস্ব বৃদ্ধি এবং রপ্তানি খাতের বৈচিত্র্যকরণের ওপর জোর দিয়েছেন। এফবিসিসিআই-এর প্রশাসক মো. ফজলুল হক সতর্ক করে বলেছেন, এই বাড়তি সময়কে কেবল বিশ্রামের সুযোগ হিসেবে না দেখে বরং প্রস্তুতি হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। পোশাক খাতের পাশাপাশি চামড়া, প্লাস্টিক এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তিনি উল্লেখ করেন।
মূলত কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মতো সংকটের কারণে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এই সময় বৃদ্ধির আবেদন জানানো হয়েছিল। উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালে এলডিসিভুক্ত হওয়া বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি—তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়েছিল, যার ভিত্তিতে ২০২৪ সালে উত্তরণের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখে এই সময়সীমা বাড়ানো হলো।




