বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে এবং বাজারের কারসাজি শনাক্ত করতে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই লক্ষ্যে ২০১২ সালের বিদ্যমান প্রতিযোগিতা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। গত ১৭ অক্টোবর এই সংশোধনী আইনের একটি খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে আগামী এক মাস সাধারণ মানুষের মতামত গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত সংশোধনীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, কমিশনের কর্মকর্তাদের এখন থেকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালানোর ক্ষমতা দেওয়া। এর ফলে বাজারে যোগসাজশ করে দাম বাড়ানো, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানকে বাধা দেওয়া কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করার প্রমাণ খুঁজতে তারা সংশ্লিষ্ট কার্যালয়, ভবন বা কক্ষে প্রবেশ করতে পারবেন। তল্লাশির সময় প্রয়োজনীয় নথিপত্র, হিসাবের খাতা, কম্পিউটার, সফটওয়্যার এবং সংরক্ষিত তথ্য জব্দ করার আইনি সুযোগ থাকবে কর্মকর্তাদের। তবে এই প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ রাখতে অন্তত দুজন সাক্ষীর উপস্থিতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ভিডিও নথিবদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। জব্দ করা সামগ্রীর তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে তার একটি অনুলিপি দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন এ এইচ এম আহসান জানিয়েছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর আইনি কাঠামোর কথা মাথায় রেখে এই আইনকে যুগোপযোগী করা হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন, কমিশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৫৪টি মামলা করা হলেও উচ্চ আদালতে মামলা আটকে থাকায় খুব বেশি কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যায়নি। আইন সংশোধন হলে কমিশনের কার্যক্রমে গতি আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

নতুন খসড়ায় ডিজিটাল বাজারের কারসাজি রুখতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি গ্রাহকের তথ্য নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রবেশে বাধা দেয় কিংবা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে দাম নির্ধারণ করে বাজারে প্রভাব ফেলে, তবে সেটিকে আইনের আওতায় আনা হবে। এছাড়া, কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মিলে সম্মিলিতভাবে বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে আইনের অপব্যবহার করলে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, গোপনে করা ব্যবসায়িক যোগসাজশ বা 'কার্টেল'-এর প্রমাণ পেতে যারা সহযোগিতা করবে এবং দোষ স্বীকার করবে, তাদের শাস্তি কমিয়ে দেওয়ার বা অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

বিচারিক প্রক্রিয়ায় গতি আনতে কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল শোনার জন্য একটি পৃথক 'প্রতিযোগিতা আপিল ট্রাইব্যুনাল' গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ট্রাইব্যুনালে একজন চেয়ারম্যান এবং সর্বোচ্চ দুজন সদস্য থাকবেন। হাইকোর্টের বিচারপতি অথবা ২০ বছরের বিচারিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োজিত হতে পারবেন। অন্যদিকে, সদস্য হতে পারবেন আইন, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য বা হিসাববিজ্ঞানে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিরা। কোনো ব্যক্তি কমিশনের আদেশে সংক্ষুব্ধ হলে ৩০ দিনের মধ্যে এখানে আপিল করতে পারবেন, যার নিষ্পত্তি হবে ৯০ দিনের মধ্যে। তবে আর্থিক জরিমানার ক্ষেত্রে আপিল করতে হলে জরিমানার ২৫ শতাংশ জমা দিতে হবে।

সাবেক বাণিজ্যসচিব আতাউর রহমান খান জানান, কমিশনকে আরও কার্যকর করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, তল্লাশির ক্ষমতা দিয়ে বাজারে ভীতিকর পরিবেশ তৈরির চিন্তা নেই, বরং তদন্তের স্বার্থে দাপ্তরিক তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যই প্রধান। এছাড়া, বর্তমান আইনের যে ধারায় সরকারের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত বলে গণ্য করা হয়, তা বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে কমিশনের বিচারিক ক্ষমতা খর্ব হবে না এবং চলমান রিট মামলাগুলোর জটিলতা দূর হবে বলে মনে করা হচ্ছে।