বিমানের জানালা সাধারণ কাচ বা প্লাস্টিকের টুকরো নয়, বরং এটি অত্যন্ত জটিল প্রকৌশল এবং নিখুঁত বিজ্ঞানের সমন্বয়ে তৈরি একটি সুরক্ষা কবচ। আকাশপথে তীব্র বায়ুচাপ, চরম তাপমাত্রা এবং পাখির আঘাতের মতো মারাত্মক ঝুঁকি থেকে যাত্রীদের রক্ষা করতে এই জানালাগুলো বিশেষ প্রযুক্তিতে প্রস্তুত করা হয়। তবে সম্প্রতি এই বিশেষ যন্ত্রাংশ তৈরির বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত লস অ্যাঞ্জেলেসের ‘জিকেএন অ্যারোস্পেস’ নামক একটি কোম্পানিতে, যারা বিমান শিল্পের জন্য জানালাসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে। গত মে মাসের শেষ সপ্তাহে এই কারখানার একটি রাসায়নিক সংরক্ষণ ট্যাংকে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে। ৭ হাজার গ্যালনের বেশি বিষাক্ত ‘মিথাইল মেথাক্রিল্যাট’ (এমএমএ) সংরক্ষিত ওই ট্যাংকে বিস্ফোরণের আশঙ্কা তৈরি হলে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই রাসায়নিকটি ত্বক ও ফুসফুসের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গার্ডেন গ্রোভ শহরের প্রায় ৫০ হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং ফায়ার সার্ভিস ট্যাংকের তাপমাত্রা কমাতে পানি ব্যবহার করে। যদিও কোনো বিস্ফোরণ ঘটেনি, তবে এই ঘটনার প্রভাবে প্ল্যান্টের জানালা উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে অগাস্ট মাসে জিকেএন এবং স্থানীয় প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের জন্য ১০ কোটি ডলারের ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করে।
এই দুর্ঘটনা বৈশ্বিক বিমান উৎপাদন শিল্পে মৃদু ধাক্কা দিয়েছে। ব্রিটিশ মূল কোম্পানি ‘মেলরোজ ইন্ডাস্ট্রিজ’ জানিয়েছে, গার্ডেন গ্রোভ প্ল্যান্টের উৎপাদন বর্তমানে স্বাভাবিকের তুলনায় মাত্র ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগামী ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পূর্ণ ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এভিয়েশন বিশ্লেষক মারিসা গার্সিয়া মনে করেন, এই খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো যোগ্য সরবরাহকারী কোম্পানির সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। ফলে একটি কোম্পানির সমস্যায় পুরো সিস্টেম অগোছালো হয়ে পড়ে। এই ঘাটতি মোকাবিলায় বোয়িং তাদের সরবরাহকারীকে সহায়তা করার কথা জানিয়েছে এবং এয়ারবাস বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষজ্ঞ মাইক স্টেনজেল জানান, নতুন কোম্পানির জন্য এই বাজারে প্রবেশ করা কঠিন কারণ এখানে অত্যন্ত কঠোর নিয়মকানুন রয়েছে। ফলে নতুন প্লেনের বদলে এয়ারলাইনগুলো পুরনো বিমান চালাতে বাধ্য হচ্ছে।
প্লেনের জানালার নির্মাণ প্রক্রিয়ার বিষয়ে ফরাসি কোম্পানি ‘স্যঁ-গোবা অ্যারোস্পেস’-এর জেনারেল ম্যানেজার জঁ-এরিক ভার্মন্ট বিস্তারিত জানিয়েছেন। বিমান চালনার ভাষায় একে বলা হয় ‘ট্রান্সপারেন্সিজ’। যাত্রীদের আসনের পাশের ডিম্বাকৃতি জানালাগুলো মূলত অ্যাক্রেলিক শিট বা প্লাস্টিকভিত্তিক উপাদান দিয়ে তৈরি হয়। এগুলো সাধারণত দুটি স্তরে গঠিত থাকে এবং উচ্চচাপে এর স্থায়িত্ব পরীক্ষা করা হয়। বর্তমানে বাণিজ্যিক আকর্ষণের জন্য জানালাগুলো বড় করার প্রবণতা বাড়ছে, যার ফলে বাড়তি নিরাপত্তা পরীক্ষা প্রয়োজন হয়।
অন্যদিকে, ককপিটের জানালা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রযুক্তিতে তৈরি। এগুলো রাসায়নিকভাবে মজবুত করা বিশেষ কাচ, যেখানে সোডিয়াম আয়নের বদলে পটাশিয়াম আয়ন প্রতিস্থাপন করা হয়, যাতে আণবিক গঠন আরও শক্ত হয়। আধুনিক বিমানে জ্বালানি সাশ্রয়ে কার্ভড বা বাঁকানো জানালা ব্যবহৃত হয়, তবে এর নির্মাণ অত্যন্ত কঠিন কারণ সামান্য ত্রুটিও পাইলটের দৃষ্টিগোচর হয়। ককপিটের জানালার প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো পাখির আঘাত। পাখির গতি নয়, বরং বিমানের প্রচণ্ড গতির কারণে এই আঘাত মারাত্মক হয়। এজন্য স্যঁ-গোবা বাস্তব পরীক্ষার মাধ্যমে এর সক্ষমতা যাচাই করে। সম্প্রতি লন্ডন থেকে উড্ডয়ন করা একটি বিমানের ককপিটের জানালায় ফাটল ধরায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছিল, যদিও বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করে। পরিশেষে, বিশেষজ্ঞ মাইক স্টেনজেলের মতে, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশের সংযোগস্থলে অবস্থান করায় এই জানালাগুলো অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির পণ্য হওয়া আবশ্যক।




