যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নেতৃত্বদানকারী কেভিন ওয়ার্শের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যে এক নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি মুদ্রাবাদ বা 'মনিটারিজম'-এর মৌলিক নীতিগুলোকে উপেক্ষা করে আসছিল, এমনকি প্রাক্তন চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলও এই মতবাদকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবে বর্তমান চেয়ারম্যান ওয়ার্শ এখন স্পষ্টভাবে মনিটারিস্ট দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি তাঁর অনুরাগ প্রকাশ করছেন, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রচলিত অর্থনৈতিক কৌশলে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মনিটারিজম মূলত এমন একটি অর্থনৈতিক মতবাদ যা বিশ্বাস করে যে, সম্পদের মূল্য, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির স্তরের ওপর অর্থের পরিমাণের ব্যাপক প্রভাব থাকে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, জাতীয় আয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং মুদ্রার পরিমাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ আধুনিক অর্থনীতিতে ব্যাংকগুলোই অধিকাংশ অর্থ তৈরি করে। তাই মুদ্রানীতির লক্ষ্য অর্জনে অর্থ সরবরাহের বৃদ্ধির হারের দিকে নজর দেওয়া সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি বলে মনে করা হয়। অথচ বর্তমান সময়ের অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ এবং ফেডারেল রিজার্ভের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাগুলো মূলত কেইনসীয় মডেল অনুসরণ করেন, যেখানে অর্থ ও ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এই অদূরদর্শিতার কারণেই কোভিড-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতির তীব্রতা কেউ আগে থেকে অনুমান করতে পারেননি বলে মনে করা হচ্ছে।

কেভিন ওয়ার্শের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ পাওয়া গেছে গত আগস্টে অনুষ্ঠিত জ্যাকসন হোল সিম্পোজিয়ামে, যেখানে তিনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে অর্থ সরবরাহের পরিবর্তনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। এরপর ১৬ সেপ্টেম্বর ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটির (FOMC) সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, জ্বালানি বা খাদ্যের দাম বৃদ্ধি সরাসরি মুদ্রাস্ফীতির কারণ নয়। ফেডারেল রিজার্ভের কাজ হলো সামগ্রিক মূল্যস্তর নিয়ন্ত্রণ করা, ব্যক্তিগত বা নির্দিষ্ট পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা নয়।

নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর সুদের হারের প্রভাব নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ওয়ার্শ জানান, ফেডারেল রিজার্ভ বন্টনমূলক প্রশ্নে কাজ করে না; বরং জিডিপি, শ্রমবাজার এবং সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতির মতো সমষ্টিগত বিষয়ের দিকে নজর দেয়। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, স্থিতিশীল মূল্যস্তর থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হন সেই সব নিম্ন আয়ের মানুষ, যাদের কোনো আর্থিক সম্পদ নেই এবং যারা কেবল মাসিক বেতনের ওপর নির্ভরশীল।

এছাড়া, তিনি সাম্প্রতিক সিপিআই (CPI) ডেটার প্রভাব নিয়ে জানান যে, স্বল্পমেয়াদী তথ্যের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদী ট্রেন্ড বা প্রবণতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, মুদ্রাস্ফীতির স্বল্পমেয়াদী পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয় কারণ তথ্যের মধ্যে অনেক বিশৃঙ্খলা থাকে। পাশাপাশি, তিনি 'নিউট্রাল রেট' বা ভারসাম্যজাত সুদের হারের মতো তাত্ত্বিক ধারণাকে বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বহীন বলে অভিহিত করেন। তাঁর পরিবর্তে তিনি অর্থের পরিমাণের তত্ত্ব বা 'কোয়ান্টিটি থিওরি অফ মানি'-র ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

ওয়ার্শ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, গত ৬-৯ মাসের অর্থ সরবরাহের বৃদ্ধির হার (৬-৮%) ছিল অত্যন্ত বেশি। ফেডারেল রিজার্ভের ২% মুদ্রাস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য অর্থ সরবরাহের বৃদ্ধির হার কমিয়ে প্রায় ৬%-এ নামিয়ে আনতে হবে। সামগ্রিকভাবে, কেভিন ওয়ার্শের এই নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো ফেডারেল রিজার্ভের দীর্ঘদিনের নীতিমালার বিপরীতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে গণ্য হচ্ছে।