২০২৬ সালের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন শ্রেণির 'একদিনের কোটিপতি' তৈরি হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের পাশাপাশি ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এখন তেল পরিবহনের ব্যবসায়ীরা বিপুল মুনাফা অর্জন করছেন। বিশেষ করে যারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে তেল পরিবহনে সাহসী ভূমিকা রাখছেন, তাদের আয় এখন সাত অঙ্কের ঘরে পৌঁছেছে।

বাল্টিক এক্সচেঞ্জের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, পারস্য উপসাগর থেকে চীনে তেল বহনের জন্য একটি জাহাজের দৈনিক ভাড়া ১০ লক্ষ ৩৫ হাজার ডলারে পৌঁছেছে, যা এই প্রথম সাত অঙ্কের মাইলফলক স্পর্শ করল। এর বিপরীতে, প্ল্যাটস ভিএলসিসি (Platts VLCC) সূচক অনুযায়ী একই ধরণের বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের দৈনিক খরচ ছিল প্রায় ২ লক্ষ ৮ হাজার ডলার। ইরান যুদ্ধের সপ্তম মাসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক যাতায়াত হ্রাস পেলেও, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানির প্রয়োজনীয়তা আরও তীব্র হয়েছে। সরবরাহ সীমিত হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম আবারও ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

ভর্টেক্সার প্রধান ফ্রেইট অ্যানালিস্ট ইয়োআন্নিস পাপাদিমিত্রিউ জানান, এই আকাশচুম্বী ভাড়ার পেছনে মূল কারণ হলো ঝুঁকি এবং তেলের প্রয়োজনীয়তা। যুক্তরাজ্য নৌবাহিনীর একটি সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, গত শুক্রবার হরমুজ প্রণালীতে দুটি ট্যাঙ্কারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার পাল্টা আক্রমণ এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জাহাজগুলোর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।

এই সংঘাতের ফলে জাহাজগুলোর বিমা প্রিমিয়ামও নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধের আগে যেখানে বিমার হার ছিল সম্পদের ০.৫% থেকে ১%, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ শতাংশে। এই অতিরিক্ত বিমা খরচ শেষ পর্যন্ত চার্টারার বা ভাড়াটিয়াদের বহন করতে হচ্ছে। পাশাপাশি, বাজারে সক্রিয় শিপিং কোম্পানির সংখ্যা কমে আসায় এবং কিছু বড় প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া প্রভাব বাড়ায় তারা ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়িয়ে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক কোম্পানি এখন নিজেদের বহর বাড়িয়ে সাপ্লাই চেইন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

তবে এই পরিস্থিতি সবার জন্য সুখকর নয়। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেল শোধনাগারগুলো। তাদের একদিকে যেমন উচ্চ ভাড়া দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিকল্প পথে জাহাজ ঘুরিয়ে আনার কারণে সময় বেশি লাগছে এবং অপরিশোধিত তেলের দামও বাড়ছে। যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর; উদাহরণস্বরূপ, ডিজেলের দাম আগেকার তুলনায় ৬০% বেড়ে প্রথমবারের মতো ৬ ডলার ছাড়িয়েছে।

অন্যদিকে, শিপিং কোম্পানি এবং শিপব্রোকাররা এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। বিশ্বের বৃহত্তম শিপব্রোকার ক্লার্কসন্স গত প্রান্তিকে তাদের পরিচালন মুনাফায় বছর-ভিত্তিক ৫৫% প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এর পাশাপাশি মর্নিংস্টার ডাটা অনুযায়ী, তেল ফ্রেইট ফান্ড 'ব্রেকওয়েভ ট্যাঙ্কার শিপিং ইটিএফ' (BWET) এই বছর এখন পর্যন্ত ৩,৬০০%-এর বেশি রিটার্ন দিয়েছে, যা এই খাতের মুনাফার প্রতি বিনিয়োগকারীদের অগাধ আত্মবিশ্বাস প্রমাণ করে।