বিশ্ববাজারে জেট ফুয়েলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বিমান পরিবহন সংস্থাগুলো তাদের ব্যবসায়িক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। বর্তমানে প্রতি গ্যালন জ্বালানির দাম ৪.৭১ ডলারে পৌঁছেছে, যা এক বছর আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি এবং প্রায় ২০ বছরের সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি। এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় আমেরিকান এয়ারলাইন্স, ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স এবং সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্স তাদের সবচেয়ে কম লাভজনক বা 'প্রান্তিক রুটগুলো' (marginal routes) বাতিলের কথা বিবেচনা করছে।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর মরগান স্ট্যানলির বার্ষিক লাগুনা কনফারেন্সে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের সিএফও ডেভন মে জানান, জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে কোম্পানির চতুর্থ প্রান্তিকের সম্ভাব্য ব্যয়ে অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হয়েছে। ফলস্বরূপ, তারা ডিসেম্বর মাসের কিছু ফ্লাইট বাতিল করেছে এবং আগামী বছরের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। একই সম্মেলনে সাউথওয়েস্টের সিএফও টম ডক্সি উল্লেখ করেন, তারা প্রথমে ফ্লাইট সক্ষমতা ২-৩ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা করলেও জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে সেই পূর্বাভাস অর্ধেক কমিয়ে এনেছেন।
ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের সিএফও মাইক লেসকিনেন বিশ্লেষকদের জানান, প্রতিটি রুটের মুনাফার হার ভিন্ন হয়। যখন জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পায়, তখন সবচেয়ে কম মুনাফায় চলা রুটগুলো বজায় রাখা আর্থিকভাবে আর যুক্তিযুক্ত থাকে না। তাই মুনাফা এবং নগদ অর্থ সর্বোচ্চ করার লক্ষ্যে তারা ডিসেম্বর মাসে ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে এবং খরচ অব্যাহত থাকলে আগামী বছর আরও রুট ছেঁটে ফেলতে পারে। তবে তিনি জানান, চতুর্থ প্রান্তিকের ৩৫ শতাংশ টিকিট ইতিমধ্যেই বুক করা হয়ে যাওয়ায় এখনই দাম বাড়ানো সম্ভব নয়, তবে ধীরে ধীরে এই বাড়তি খরচ যাত্রীদের ওপর চাপানো হবে।
খরচ সামলাতে এই তিনটি সংস্থাসহ প্রায় সব বিমান সংস্থা তাদের চেক-ইন ব্যাগেজ ফি বাড়িয়েছে। যদিও ইউনাইটেড এবং আমেরিকান কতটি ফ্লাইট বাতিল করেছে তার সঠিক সংখ্যা জানায় অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তবে সাউথওয়েস্টের একজন মুখপাত্র ফরচুনকে জানিয়েছেন, তাদের রুট পরিবর্তনের প্রভাব খুবই সামান্য এবং এটি কোনো বড় আকারের রুট বা বিমানবন্দর ত্যাগের ঘটনা নয়।
ইরানের সাথে সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জেট ফুয়েলের দামে। ফলে বিমান সংস্থাগুলোকে এই বিপুল খরচ বহন করতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক নথিতে দেখা গেছে, বছরের প্রথম ছয় মাসে জ্বালানি বাবদ ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ৮.২ বিলিয়ন ডলার এবং আমেরিকান এয়ারলাইন্স ৭.৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৯ শতাংশ বেশি। সাউথওয়েস্টের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.৬ বিলিয়ন ডলারে, যা ৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি।
যাত্রীদের জন্য এই পরিস্থিতি বেশ দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে। রুট কমে যাওয়ায় ফ্লাইটের পছন্দ সীমিত হবে, সুবিধাজনক সময় পাওয়া কঠিন হবে এবং নন-স্টপ ফ্লাইটের বদলে লে-ওভার বা ট্রানজিটের ওপর নির্ভর করতে হবে। ব্যুরো অফ লেবার স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে বিমান ভাড়া এক বছরের তুলনায় ২৩.৪ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে সামগ্রিক ভোক্তা মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩.৪ শতাংশ।
এই জ্বালানি সংকট কেবল আমেরিকায় নয়, আটলান্টিকের ওপারে ইউরোপেও প্রকট। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর অধিক নির্ভরশীলতার কারণে ইউরোপের বাজেট এয়ারলাইন রায়ানএয়ার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা তাদের বার্ষিক যাত্রী পূর্বাভাসের সংখ্যা ২১৬ মিলিয়ন থেকে কমিয়ে ২১৪ মিলিয়নে নামিয়ে এনেছে। রায়ানএয়ারের সিইও মাইকেল ও'লিয়ারি সতর্ক করেছেন যে, তেলের দাম আরও বাড়লে তাদের সস্তা ফ্লাইটের টিকিটের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে।




