বিজ্ঞান মেলাগুলোতে আলুর সাহায্যে ছোট বাল্ব জ্বালানোর প্রজেক্ট অনেকের কাছেই বিস্ময়ের। তবে আলু নিজে থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করে না, বরং এর অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক গঠন বিদ্যুৎ পরিবহনে সাহায্য করে। মূলত বিদ্যুৎ পরিবাহীর দুটি ধরন থাকে—ধাতব এবং আয়নিক। তামা বা অ্যালুমিনিয়ামের তার ধাতব পরিবাহীর উদাহরণ, যা ইলেকট্রন চলাচলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়। অন্যদিকে, আলু বা মানুষের শরীরের টিস্যুগুলো হলো আয়নিক পরিবাহী। এদের ভেতরে থাকা তড়িৎ বিশ্লেষ্য পদার্থ বা 'ইলেক্ট্রোলাইট' মুক্ত আয়নের মাধ্যমে বিদ্যুৎ প্রবাহ সচল রাখে।
পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মাইকেল হিকনার ব্যাখ্যা করেন যে, লবণ মিশ্রিত পানিতে যেভাবে আয়নগুলো বিদ্যুৎ পরিবহন করে, ফল ও সবজিও ঠিক একইভাবে কাজ করে। লবণের দ্রবণে থাকা ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আয়নগুলো ভোল্টেজ প্রয়োগ করলে সহজেই চলাচল করতে পারে। যেহেতু প্রায় সব ফল বা সবজিতেই এই ধরনের ইলেক্ট্রোলাইট উপাদান থাকে, তাই তাত্ত্বিকভাবে সবগুলিই বিদ্যুৎ পরিবহন করতে সক্ষম। তবে কার্যকারিতা সব ক্ষেত্রে সমান নয়। বিশুদ্ধ পানির চেয়ে লবণাক্ত পানি যেমন দ্রুত বিদ্যুৎ পরিবহন করে, তেমনি পটাশিয়াম বা সোডিয়াম সমৃদ্ধ ফল ও সবজি বিদ্যুৎ আধান বহনে বেশি কার্যকর হয়।
প্রকৃতিগত গঠনের কারণে কিছু ফল অন্যগুলোর চেয়ে বেশি কার্যকর। যেমন, আলুর গঠন বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। অধ্যাপক হিকনারের মতে, আলুকে লবণ-পানিতে ভিজিয়ে রাখলে এর বিদ্যুৎ পরিবহনের ক্ষমতা আরও বেড়ে যায়, কারণ সোডিয়াম আয়নগুলো আয়ন চলাচলের পথকে আরও সহজ করে তোলে। বিপরীতে, কমলালেবুতে পটাশিয়াম থাকলেও এর কোষীয় গঠন বিভক্ত থাকায় আয়ন চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। একইভাবে টমেটোর অগোছালো ও রসালো গঠনের কারণে এটি খুব একটা কার্যকর হয় না বলে মনে করেন রুটগার্স ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক পল তাখিস্টভ।
কোনো ফল বা সবজিকে ব্যাটারিতে রূপান্তর করতে হলে দুটি ভিন্ন ধাতুর ইলেকট্রোড, যেমন তামা ও দস্তার প্রয়োজন হয়। একটি তামার মুদ্রা এবং দস্তার পেরেক আলুর ভেতরে পুঁতে তার দিয়ে যুক্ত করলে একটি পূর্ণাঙ্গ ইলেকট্রিক সার্কিট তৈরি হয়। ধাতুর মধ্যকার শক্তির পার্থক্যের কারণে ইলেক্ট্রোলাইটের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয় এবং আয়নগুলো তারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভোল্টেজ তৈরি করে।
তবে এই প্রাকৃতিক ব্যাটারি দিয়ে স্মার্টফোন বা ট্যাবলেটের মতো বড় ডিভাইস চার্জ করা বাস্তবসম্মত নয়। একটি আলু থেকে সাধারণত মাত্র ১.২ ভোল্টের মতো সামান্য বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। ফোন চার্জ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত শক্তি পেতে হলে সারিবদ্ধভাবে অসংখ্য আলুর ব্যাটারি যুক্ত করতে হবে, যা অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। তাই এই পদ্ধতিটি মূলত বিজ্ঞান পরীক্ষার জন্য উপযোগী, বাস্তব ব্যবহারিক চার্জিংয়ের জন্য নয়।




