এশিয় অঞ্চলের ধনী পরিবারগুলো তাদের দানশীল বা পরোপকারী কাজের ক্ষেত্রে ঠিক তেমন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে, যেমনটি তারা ব্যবসার ক্ষেত্রে করে। কেবল অর্থ প্রদান না করে তারা সরাসরি ব্যবস্থাপনা এবং কাজের ফলাফলের ওপর নিবিড় নজরদারি রাখতে পছন্দ করে। হংকংয়ে অনুষ্ঠিত 'ফিলানথ্রপি ফর বেটার সিটিজ ফোরাম'-এ মার্কিন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান 'ব্রিজস্প্যান গ্রুপ' প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই বিষয়টি উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এশিয়ার ধনী পরিবারগুলোর সম্পদের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে নতুন। ব্রিজস্প্যান গ্রুপের গবেষণায় অংশগ্রহণকারী এশিয়ান পরিবারগুলোর প্রায় ৯৪ শতাংশই প্রথম বা দ্বিতীয় প্রজন্মের সম্পদশালী, যেখানে উচ্চ আয়ের অন্যান্য অর্থনীতির দেশগুলোতে এই হার ৮৫ শতাংশ। এছাড়া, এশিয়ার অধিকাংশ ধনী পরিবার এখনো তাদের সেই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে যার মাধ্যমে তারা সম্পদ অর্জন করেছে। এই ব্যবসায়িক মালিকানার প্রভাব তাদের দান করার পদ্ধতিতে স্পষ্ট। এশিয়ায় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দান করার প্রবণতা প্রবল; মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ৯৫ শতাংশ এবং উচ্চ আয়ের দেশগুলোর ৮০ শতাংশ ধনী পরিবার এই পদ্ধতি অনুসরণ করে। বিপরীতে, পশ্চিমা বিশ্বের উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোর মাত্র ২৮ শতাংশ তাদের ব্যবসার মাধ্যমে দান করে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, বিল গেটস এবং ওয়ারেন বাফেট তাদের নিজস্ব ফাউন্ডেশন তৈরি করেছেন, মাইক্রোসফট বা বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের মাধ্যমে দান করেননি।
ব্রিজস্প্যান-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া প্রধান গুয়েন্ডোলিন লিম জানান, করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার অভ্যাস তাদের দানশীলতার ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়। তিনি একে 'কংলোমারেট যুগের' প্রভাব হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে এশীয় টাইকুনরা বাজারের শূন্যস্থান খুঁজে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা গড়ে তুলেছিলেন। পরোপকারী কাজের ক্ষেত্রেও তারা একই পদ্ধতি অনুসরণ করেন; যখন দেখেন কোনো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বা সরকার নির্দিষ্ট কাজে সক্ষম নয়, তখন তারা নিজেরাই সেই প্রকল্পের অর্থায়ন এবং ব্যবস্থাপনা—উভয় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অন্যদিকে, পাশ্চাত্যের দাতাগণ প্রতিষ্ঠিত নাগরিক সমাজ বা সিভিল সোসাইটির ওপর ভরসা করে কেবল অনুদান প্রদান করেই সন্তুষ্ট থাকেন।
সরকারি প্রশাসনের সাথে কাজ করার ক্ষেত্রেও এশীয় পরিবারগুলোর এক অনন্য প্রবণতা লক্ষ্য করা হয়েছে। তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি এশীয় পরিবার সরকারের সাথে অংশীদারিত্বে কাজ করে, যেখানে এশিয়ার বাইরের ক্ষেত্রে এই হার ৫৮ শতাংশ। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ থাকায় তারা এই প্রক্রিয়ায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, যা অনেক মার্কিন বা ইউরোপীয় দাতার কাছে অস্বস্তির কারণ। এশীয় দাতাগণ প্রায়ই ছোট আকারের পাইলট প্রোগ্রাম চালু করে এর কার্যকারিতা প্রমাণ করেন এবং পরবর্তীতে সফল মডেলটি বড় পরিসরে চালনার জন্য সরকারের হাতে তুলে দেন। এছাড়া, তারা তাদের কাজের রিপোর্ট দিতে বেশি আগ্রহী। ৮০ শতাংশের বেশি এশীয় পরিবার তাদের কাজের আউটপুট (যেমন—কতটি স্কুল তৈরি বা কতজন শিক্ষক প্রশিক্ষিত) প্রকাশ করে, যেখানে উচ্চ আয়ের অন্যান্য অর্থনীতির দেশগুলোতে এই হার মাত্র ৪৫ শতাংশ। তবে ফলাফল বা আউটকামের প্রকৃত প্রভাব পরিমাপের ক্ষেত্রে উভয় অঞ্চলই পিছিয়ে।
২০২০ থেকে ২০২৪ সালের গড় বার্ষিক দানে করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক র্যাঙ্কিংয়ে হংকং জকি ক্লাব এশিয়ায় শীর্ষস্থান দখল করেছে (৭৭৪ মিলিয়ন ডলার), যার পরেই রয়েছে টেনসেন্ট (৪০৪ মিলিয়ন ডলার)। বিশ্বব্যাপী শীর্ষ ১০টি করপোরেট দাতার তালিকায় এটি একমাত্র এশীয় প্রতিষ্ঠান। তবে সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক দানে গেটস ফাউন্ডেশন ৬.৫ বিলিয়ন ডলার নিয়ে শীর্ষে রয়েছে।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এশিয়ার উন্নয়ন তহবিলে ২৬ ট্রিলিয়ন ডলারের ঘাটতি হতে পারে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ইউএসএআইডি (USAID)-এর কর্মসূচী খর্ব করায় ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোতে উন্নয়ন বাজেটে বিশাল ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গুয়েন্ডোলিন লিমের মতে, যদিও শুধু দানশীলতা দিয়ে এই বিশাল শূন্যতা পূরণ সম্ভব নয়, তবুও এই 'এশীয় দশকে' নিজেদের মানুষের পাশে দাঁড়াতে এশীয় দাতাদেরই এগিয়ে আসতে হবে।




