তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ, যারা আমাদের সমাজে হিজড়া হিসেবে পরিচিত, তারা জন্মলগ্ন থেকেই নানাবিধ সামাজিক ও পারিবারিক বৈষম্যের সম্মুখীন হন। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের চরম নিগ্রহের কারণে তাদের নিজের জন্মগৃহ ছেড়ে চলে যেতে হয়। এই করুণ বাস্তবতারই এক প্রতিচ্ছবি ১৬ বছর বয়সী নুজাইফা, যার বাড়ি রাজশাহী সদরে। নুজাইফার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, শৈশব থেকেই তাকে হিজড়া পরিচয়ের কারণে চরম লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছে। কেবল পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই নয়, বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও তাকে প্রতিনিয়ত বৈষম্যের মোকাবিলা করতে হয়। মাদ্রাসায় পড়াশোনার সময় সহপাঠীদের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে নানা ধরনের কটূক্তি। নুজাইফা জানান, সহপাঠীরা তাকে প্রশ্ন করত, 'তুমি মেয়েদের মতো কেন?' এমনকি সমবয়সী ছাত্ররাও তাকে 'হিজড়া' বলে উপহাস করত।
এমন বৈষম্য ও উপহাস একজন মানুষের মনে কতটা দীর্ঘস্থায়ী এবং গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে, তা ব্যক্ত করেছেন আবু হাসনা পলি নামের একজন হিজড়া ব্যক্তি। পলির মতে, মানসিক চাপ এবং ক্রমাগত বৈষম্যের ফলে তিনি নিজেকে সমাজ, পরিবার এবং রাষ্ট্রের কাছে একটি 'বোঝা' হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিলেন। নিজের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই এবং জীবন দিয়ে বিশেষ কিছু করা সম্ভব হবে না—এমন এক চরম হতাশাবোধ তাকে গ্রাস করেছিল।
রাজশাহীতে হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন 'দিনের আলো হিজড়া সংঘ'-এর সভাপতি মিস মোহনা মনে করেন, হিজড়া শিশুদের প্রতি সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন করা এখন সময়ের দাবি। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, সাধারণ শিশুদের সাথে হিজড়া শিশুদের স্বাভাবিকভাবে মেলামেশার পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের পড়াশোনার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। মোহনার মতে, সমাজের মানুষকে এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে যে, যে কোনো পরিবারের সন্তানই এমন হতে পারে। সমাজ যদি তাদের গ্রহণ না করে এবং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হয়, তবে এই জনগোষ্ঠীর মানুষকে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।
এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতার প্রভাব সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান জানান, সমাজের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষগুলো নিজেদের মূল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করেন। এই দীর্ঘমেয়াদী বিচ্ছিন্নতাবোধ তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অত্যন্ত গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।




