পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সম্প্রতি গঠিত তিনটি কমিটির সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের ৫২ জন বিশিষ্ট নাগরিক। একটি যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে তাঁরা দাবি জানিয়েছেন যে, পাহাড়ের এই সমস্যাটি মূলত একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সংকট, যার সমাধান প্রয়োজন। তাঁদের মতে, ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির প্রায় ২৯ বছর অতিবাহিত হলেও এর মৌলিক শর্তগুলো এখনো কার্যকর করা হয়নি, যার ফলে ওই অঞ্চলে প্রকৃত শান্তি এবং আদিবাসীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর পার্বত্য এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে। এই অস্থিতিশীলতার সুযোগে পাহাড়ের বাসিন্দারা অন্তত দুবার সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার হয়েছেন, যাতে অন্তত সাতজন আদিবাসী প্রাণ হারিয়েছেন। অভিযোগ করা হয়েছে যে, পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব স্থানীয় প্রতিনিধিদের হস্তান্তরের কথা থাকলেও তা এখন পর্যন্ত করা হয়নি।

গত ১০ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তিনটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে 'পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটি', স্বরাষ্ট্রসচিবের সভাপতিত্বে 'নির্বাহী কমিটি' এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে 'পরামর্শক কমিটি' গঠন করা হয়েছে। এই কাঠামোর আওতায় পরামর্শক কমিটিকে আগামী দুই মাসের মধ্যে নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন, উন্নয়ন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ জমা দিতে বলা হয়েছে। পরবর্তীতে সেই সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে নির্বাহী কমিটি তিন মাসের মধ্যে একটি জাতীয় কর্মকৌশলের খসড়া তৈরি করবে এবং জাতীয় কমিটি তা চূড়ান্ত করবে। এছাড়া প্রচলিত আইনের পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়নের সুপারিশ করার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে নির্বাহী কমিটিকে।

তবে বিশিষ্ট নাগরিকেরা মনে করেন, যদিও এই উদ্যোগগুলো আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হয়, কিন্তু সঠিক প্রক্রিয়ার অভাব শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাঁরা আহ্বান জানিয়েছেন যেন কমিটিগুলো গোয়েন্দা সংস্থার নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে পুনর্গঠিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বৈধ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একইসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।

এই যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সুলতানা কামাল, আনু মুহাম্মদ, খুশী কবির, শিরীন পারভিন হক, ইফতেখারুজ্জামান, জেড আই খান পান্না, শহিদুল আলম, শামসুল হুদা, সুমাইয়া খায়ের, সামিনা লুৎফা, জোবাইদা নাসরীন, তাসনিম সিরাজ মাহবুব, খাইরুল চৌধুরী, মাহমুদুল সুমন, ফারহা তানজীম তিতিল, রেহনুমা আহমেদ, সুব্রত চৌধুরী, তবারক হোসেন, আবু সাঈদ খান, সাঈদ আহমেদ, মো. নুর খান, আবু আহমেদ ফয়জুল কবির, পাভেল পার্থ, ঈশিতা দস্তিদার, সায়দিয়া গুলরুখ, ইমতিয়াজ মাহমুদ, মনিন্দ্র কুমার নাথ, রোজিনা বেগম, জাকির হোসেন, সাইদুর রহমান, মো. আলমগীর কবির, সালেহ আহমেদ, হিরণ মিত্র চাকমা, শাহেদ কায়েস, মিঠুন রাকসাম, প্রকাশ বিশ্বাস, দীপায়ন খীসা, হানা শামস আহমেদ, মুক্তাশ্রী চাকমা, বিজয় কেতন চাকমা, প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা, শিশির চাকমা, ইন্দু লাল চাকমা, নব কুমার চাকমা, প্রজ্ঞা জ্যোতি চাকমা, সিদ্ধেশ্বর চাকমা, প্রবৃত্তি কুমার চাকমা, উক্রাচিং মারমা, মংউষা থোয়াই, মংথুইপ্রু বাবুল, তনয়া ম্রো এবং প্রসন্ন কুমার চাকমা।