পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (পিআইএমএস) হাসপাতালে গত ২৬ আগস্ট এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৪টি নবজাতকের প্রাণহানি ঘটে। সম্প্রতি এই ঘটনার সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে হাসপাতালটিতে অগ্নিনিরাপত্তার চরম অভাব এবং গুরুতর প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনার কথা প্রকাশ পেয়েছে। তদন্ত অনুযায়ী, নবজাতকদের ওয়ার্ডে কোনো কার্যকর অগ্নিসংকেত ব্যবস্থা বা স্বয়ংক্রিয় পানি ছিটানোর স্প্রিংকলার সিস্টেম ছিল না। এমনকি জরুরি বহির্গমন পথগুলোর অনেকগুলো দরজাও তালাবদ্ধ ছিল, যা শিশুদের জীবন বাঁচাতে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

তদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, একটি অতিরিক্ত উত্তপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহকারী তার থেকে উৎপন্ন ছোট স্ফুলিঙ্গই এই বিশাল বিপর্যয়ের মূল কারণ। যদিও হাসপাতালের এসিগুলোতে সার্ভিসিং করা হয়েছিল, তবে সেগুলো সম্পূর্ণ নিরাপদ কি না তা যাচাই করা হয়নি। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালেই উন্নত প্রযুক্তির এসি লাগানোর অনুমতি দেওয়া হলেও আট বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের দিন ভোর ৬টা ৩৮ মিনিটে আগুন ধরা পড়লেও জরুরি সেবায় খবর দেওয়া হয় প্রায় ২০ মিনিট পর। উদ্ধারকর্মীরা যখন ৭টা ১ মিনিটে পৌঁছান, তখন তারা দেখেন অনেক দরজা বন্ধ থাকায় ভেতরে প্রবেশ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। এক দমকলকর্মী বিবিসি-কে জানান, ভেতরে ঢোকার জন্য তাদের জানালা ভাঙতে হয়েছিল এবং ভেতরে ঢুকেও ওয়ার্ডের দরজায় বাধা পান। তিনি আরও জানান, অত্যন্ত করুণ দৃশ্য ছিল সেখানে; চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো গলে শিশুদের শরীরের ওপর পড়ে গিয়েছিল।

হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক দাবি করেছিলেন যে, শিশু অপহরণের আশঙ্কায় ওয়ার্ডের দরজায় পাহারার ব্যবস্থা ছিল, তবে তা তালাবদ্ধ ছিল না। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নিরাপত্তার খাতিরে সাধারণ প্রবেশপথে কড়াকড়ি থাকলেও জরুরি বহির্গমন পথ কোনোভাবেই অবরুদ্ধ রাখা উচিত নয়। এছাড়া হাসপাতালের কর্মীদের জরুরি অবস্থায় অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করা বা নবজাতকদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার কোনো প্রশিক্ষণ বা মহড়া দেওয়া হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শী ওয়ালিদ এবং গফুর জানান, ঘটনার সময় সেখানে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল এবং কেউ কোনো নিয়ম মেনে কাজ করছিল না। দমকল বাহিনী আসার আগেই তারা কাঁচের প্যানেল ভেঙে ধোঁয়া বের করার চেষ্টা করেছিলেন।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ঘটনার মাত্র এক মাস আগে হাসপাতালের নার্সিং হোস্টেলে আগুন লেগেছিল এবং কর্তৃপক্ষকে আগুনের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে এই ব্যর্থতার জন্য হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়ী করা হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ তদন্ত প্রতিবেদনের স্বল্পমেয়াদি সুপারিশগুলো তিন মাসের মধ্যে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি সব ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা নিরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ৮ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, পিআইএমএস হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।