যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এক ভয়াবহ সংকটের কথা সামনে এসেছে, যেখানে প্রতি বছর প্রায় ২ লক্ষ মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন এমন সব ভুলে প্রাণ হারান যা সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। হৃদরোগ এবং ক্যান্সারের পর এটি এখন আমেরিকার তৃতীয় প্রধান মৃত্যুকারণ হিসেবে চিহ্নিত। বিশ্বজুড়ে এই সংখ্যাটি বছরে প্রায় ৩০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই সংকটের এক করুণ উদাহরণ অ্যান্ডার্স পেডারসনের গল্প। নিজের ৩০ বছর বয়সী বোন কেলির কিডনি বিকল হয়ে গেলে অ্যান্ডার্স স্বেচ্ছায় তাকে একটি কিডনি দান করেন। অস্ত্রোপচার সফল হলেও পরবর্তী সময়ে সঠিক পর্যবেক্ষণের অভাব এবং ভুল ওষুধ ব্যবস্থাপনার কারণে অ্যান্ডার্স কোমায় চলে যান এবং নয় দিন পর তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসকরা শুরুতে একে সাধারণ হার্ট ফেইলিওর বললেও পরবর্তীতে জানা যায়, এটি ছিল সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য কিছু গাফিলতির সমষ্টি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মৃত্যুহার ৯০ শতাংশ কমিয়ে ২০ হাজারে নামিয়ে আনা সম্ভব। এর জন্য কোনো নতুন ওষুধ বা যুগান্তকারী বিজ্ঞানের প্রয়োজন নেই; বরং ইতিমধ্যে চিহ্নিত এবং প্রমাণিত ২০টি 'এভিডেন্স-বেসড প্র্যাকটিস' বা প্রমাণ-ভিত্তিক পদ্ধতি প্রতিটি হাসপাতালে বাস্তবায়ন করলেই এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। ১৯৯৯ সালে 'টু এর ইজ হিউম্যান' নামক একটি রিপোর্ট প্রথম এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তুলে ধরলেও ২৫ বছর পর পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

বিমান চলাচলের নিরাপত্তার সাথে হাসপাতালের তুলনা করে বলা হয়, বিমান দুর্ঘটনা ঘটলে তা ব্যাপক জানত হয় এবং পাইলটরাও ঝুঁকির মুখে থাকেন, যা দ্রুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করতে বাধ্য করে। কিন্তু হাসপাতালের ক্ষেত্রে এমন কোনো চাপ নেই। ভুল চিকিৎসার ফলে রোগীর মৃত্যু হলেও চিকিৎসক বা নার্সদের ব্যক্তিগতভাবে তেমন কোনো ঝুঁকি নিতে হয় না এবং রোগীরা বাধ্য হয়ে হাসপাতালে আসেন বলে বাজারে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মান উন্নয়নের সুযোগ নেই।

তবে এই পরিবর্তন সম্ভব, যার প্রমাণ পাওয়া গেছে 'চিলড্রেনস হসপিটাল অফ অরেঞ্জ কাউন্টি' (CHOC)-এর মডেলে। সেখানে প্রমাণ-ভিত্তিক প্রটোকল বাস্তবায়ন এবং কর্মীদের বোনাসকে 'শূন্য মৃত্যু' লক্ষ্যের সাথে যুক্ত করার ফলে টানা ছয় বছর ধরে কোনো প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু হয়নি। এখানে ভুল নির্ণয়, ওষুধের ভুল, হাসপাতালের সংক্রমণ এবং সেপসিসের মতো ঝুঁকিগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

এই সমস্যা সমাধানে জো বাইডেন প্রশাসনের একটি উপদেষ্টা পরিষদ (PCAST) ২০২৩ সালে একটি রিপোর্ট জমা দিয়েছিল। সেখানে প্রস্তাব করা হয়েছিল, যেসব হাসপাতাল প্রমাণ-ভিত্তিক প্র্যাকটিস অনুসরণ করবে না এবং সেখানে রোগীর ক্ষতি হবে, তাদের বীমা বা রিইম্বার্সমেন্ট (টাকা ফেরত পাওয়া) বন্ধ করে দেওয়া হোক। অর্থাৎ, গাফিলতির আর্থিক দায়ভার হাসপাতালের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। কিন্তু রাজনৈতিক অনিচ্ছা এবং হাসপাতাল লবিস্টদের চাপের কারণে এই পদক্ষেপগুলো কার্যকর হয়নি।

পরিশেষে, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি কেবল একটি ক্লিনিক্যাল সমস্যা নয়, বরং একটি নৈতিক সংকট। যতক্ষণ পর্যন্ত না হাসপাতালগুলো তাদের আর্থিক লাভের চেয়ে রোগীর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে এবং কঠোর সরকারি তদারকি থাকবে, ততক্ষণ অ্যান্ডারসদের মতো আরও অনেক মানুষ হাসপাতালের বিছানায় প্রাণ হারাবেন।