বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগের ৩৩ নম্বর গ্যালারিতে সংরক্ষিত দুটি প্রাচীন দলিল তৎকালীন বাংলার এক অন্ধকার ও করুণ বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলেছে। তুঁতের কাগজে লেখা এই দলিল দুটিতে দেখা যায়, চরম অভাব ও দারিদ্র্যের তাড়নায় মানুষ কীভাবে নিজেদের এবং তাদের সন্তানদের অন্যের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল। এর মধ্যে একটি হলো 'মানুষ বিক্রির দলিল' এবং অন্যটি 'আত্মবিক্রয় দলিল'।
১৮০৭ সালের প্রথম দলিলটি অনুযায়ী, তৎকালীন ময়মনসিংহ পরগনার হাসানপুর চাকলার বাসিন্দা সদারাম দাস তাঁর মাত্র ছয় বছর বয়সী কন্যা সন্তানকে মাত্র ১৩ টাকা সিক্কায় বিক্রি করেছিলেন। ক্রেতা ছিলেন কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতি। ক্ষতিগ্রস্ত দলিলের যতটুকু পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তাতে দেখা যায় এই বিক্রির প্রভাব শুধু ওই শিশুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ওই কন্যার ভবিষ্যৎ সন্তানদের ওপরও ক্রেতা এবং তাঁর বংশধরদের মালিকানা বজায় থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
ঠিক এক বছর পর, ১৮০৮ সালে একই ক্রেতা কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতির কাছে নিজেকে বিক্রি করেন ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের মরিচালি গ্রামের বাসিন্দা সেখ মামুদা। তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তান—সেখ দুতিয়া এবং সেখ কাঙ্গালিয়াকেও এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করেন। এই চারজনের বিনিময়ে মামুদা পেয়েছিলেন মাত্র সাড়ে তিন টাকা সিক্কা। এই আত্মবিক্রয়ের পেছনে অন্ন ও বস্ত্রের তীব্র অভাবের কথা দলিলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেও পরবর্তী প্রজন্মের মালিকানা ক্রেতার হাতে ন্যস্ত ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক নাজমুল হোসেন এবং সাবেক অধ্যাপক মুহাম্মদ শাহজাহান মিয়া এই দলিলগুলোর পাঠোদ্ধারে সহায়তা করেছেন। তাঁদের মতে, তৎকালীন সময়ে দুর্ভিক্ষ, বন্যা বা চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে মানুষ অনাহার থেকে বাঁচতে নিজেদের দাস হিসেবে বিক্রি করতে বাধ্য হতো। ১৯৮০ সালে ময়মনসিংহের সুরেন্দ্র চন্দ্র লস্করের কাছ থেকে এই দলিল দুটি সংগ্রহ করা হয়।
বাংলার এই স্থানীয় দাসপ্রথার ইতিহাস কেবল এই দুটি দলিলে সীমাবদ্ধ নয়। মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা এবং পর্তুগিজ ব্যবসায়ী দুয়ার্তে বারবোসার বিবরণেও স্থানীয় মানুষ কেনাবেচার কথা পাওয়া যায়। এছাড়া প্রয়াত অর্থনীতিবিদ আকবর আলি খান এবং ইতিহাসবিদ ইন্দ্রাণী চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, যুদ্ধবন্দী বা বিদেশিদের পাশাপাশি নিঃস্ব স্বাধীন ব্যক্তি এবং শিশুরা দারিদ্র্যের কারণে দাসপ্রথার শিকার হতো। বিশেষ করে ময়মনসিংহ, ঢাকা ও সিলেট থেকে শিশুদের কলকাতায় নিয়ে গিয়ে গৃহস্থালি কাজে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
জাতীয় জাদুঘরের পাশাপাশি সিলেট সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিস, মতিন উদ্দিন আহমদ জাদুঘর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও এই ধরনের মানুষ বিক্রির প্রাচীন দলিল সংরক্ষিত আছে। এসব নথিতে দেখা যায়, কেউ ১০ রুপিতে নিজেকে বিক্রি করেছেন, আবার কেউ ২৮ মণ ধানের দামে মা-ছেলে বিক্রি হয়েছেন। এই সব দলিলই প্রমাণ করে যে, ইতিহাসের এক সময়ে ক্ষুধা ও ঋণের বোঝা মানুষকে স্বাধীনতার চেয়ে বেঁচে থাকাকে বেশি গুরুত্ব দিতে বাধ্য করেছিল।




