ক্রিকেট ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল—সিরিজ চলাকালীন কোচকে বাদ দেওয়া, একসঙ্গে সাতজন খেলোয়াড়কে দেশে ফেরত পাঠানো এবং তাদের জায়গায় সাতজন নতুন মুখ দলে ডাকা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চলমান টেস্ট সিরিজের মাঝপথে এমনই নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। তবে নতুন দলে আসা সাতজনের মধ্যে পাঁচজনেরই এখনো টেস্ট অভিষেক হয়নি, যা বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সরফরাজ আহমেদের ক্যারিয়ার আবারও অপ্রত্যাশিত মোড় নিয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে পাকিস্তান শাহিনস ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলের তদারকির দায়িত্ব পান তিনি। তখন পিসিবি জানিয়েছিল, দেশের ক্রিকেট কাঠামো উন্নয়ন এবং যুব দল থেকে জাতীয় দলের মধ্যে ধারাবাহিকতা তৈরি করতেই এই নিয়োগ। ডিসেম্বরে অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপে দলের পরামর্শক হিসেবে সংযুক্ত হন তিনি; সেই টুর্নামেন্টে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় পাকিস্তান, ফলে সরফরাজের কোচিং দক্ষতায় আরও আস্থা তৈরি হয় বোর্ডের। এরপর মে মাসে বাংলাদেশ সফরে টেস্ট দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব পান তিনি। কিন্তু মাত্র ছয়টি টেস্টের মাথায় সেই অধ্যায়ের অবসান ঘটল। চলতি বছরের মার্চে অবসর নেওয়া সরফরাজের এমন আকস্মিক বরখাস্ত অনেককে হতবাক করেছে।
দল থেকে বাদ পড়া খেলোয়াড়দের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সালমান আগা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি; দ্বিতীয় টেস্টে বাদ পড়ার পর এবার তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। মে মাসে সিলেটে বাংলাদেশের বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসে ৭১ রানের কার্যকরী ইনিংস খেলেছিলেন তিনি, কিন্তু এরপর টানা পাঁচটি টেস্ট ইনিংসে কোনো রান পাননি। অন্যদিকে বাঁহাতি স্পিনার আলী উসমানের অবস্থা আরও বিস্ময়কর। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পোর্ট অব স্পেনে ছয় উইকেট নিয়েছিলেন তিনি; হেডিংলিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট এবং প্রস্তুতি ম্যাচেও এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট শিকার করেছিলেন। তবে লর্ডস টেস্টে মাত্র একটি উইকেট পাওয়ায় তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ওই টেস্টে পেসারদের দাপট এবং ইংল্যান্ডের চার পেসার নিয়ে খেলার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে স্পিনারের কাছ থেকে আর কী প্রত্যাশা করা যায়—এমন প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।
পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তে ক্রিকেট বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ইংল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার কেভিন পিটারসেন এক্সে বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেছেন, পাকিস্তান এতগুলো পরিবর্তন করছে এবং খেলোয়াড়দের দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে—এটা সত্যি হতে পারে না। সাবেক কোচ মিকি আর্থার এই পদক্ষেপকে হাস্যকর আখ্যা দিয়ে বলেছেন, নিয়মিত খেলোয়াড়, কোচ ও নির্বাচক বদলানোর কারণেই পাকিস্তান সমস্যায় রয়েছে; কোনো স্থিতিশীলতা নেই। সাবেক অধিনায়ক শোয়েব মালিক মনে করছেন, এমন আচরণে ক্রিকেটারদের অসম্মান করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—যারা সিস্টেম নষ্ট করেছে, তাদের জবাবদিহি করা উচিত, বেঞ্চে থাকা বা মাত্র দুই-তিনটি টেস্ট খেলা খেলোয়াড়দের নয়। আরও বলেছেন, সফর শেষে জবাবদিহি হওয়া উচিত, মাঝপথে নয়।
শহীদ আফ্রিদিও এই সিদ্ধান্তের যুক্তি খুঁজে পাননি। এক্সে তিনি লেখেন, এই পরিবর্তনের কোনো কারণ বোঝা যাচ্ছে না। টেস্ট ম্যাচের জন্য টি-টোয়েন্টি খেলোয়াড়দের দলে নেওয়াও অর্থহীন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। মাত্র ছয়টি টেস্টের পর কোচ বাদ দেওয়ার পাশাপাশি অভিজ্ঞ নির্বাচকদের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে হতবাক করার মতো বলে উল্লেখ করেন আফ্রিদি। সিরিজের প্রথম দুই টেস্টে নিজেদের হারিয়ে খুঁজেছে পাকিস্তান, আর এই দুর্বল পারফরম্যান্সের মাঝেই দলের ভেতরে এমন নাটকীয় পরিবর্তন—যা দলের মনোবল আরও চরম পরীক্ষায় ফেলবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।



