বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার জার্সি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিয়েছেন। এই ঘোষণার ঢেউ আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনেও। ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে মেসিকে সামনে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল বাংলাদেশের দর্শকদের। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৩-১ গোলে জিতেছিল, গোল না পেলেও বল পায়ে মেসির প্রতিটি ছোঁয়ায় মাতোয়ারা হয়ে উঠেছিল গ্যালারি। দেড় দশক পর সেই মেসিই জাতীয় দলকে চিরবিদায় জানালেন, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মনে তাঁর জন্য ভালোবাসার জায়গাটুকু বিন্দুমাত্রও ক্ষয় হয়নি।
মেসির এই অবসরকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন খেলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা নিজেদের অনুভূতি জানিয়েছেন। হকি খেলোয়াড় আমিরুল ইসলামের কাছে মেসি মানে শৈশবের মুগ্ধতা। ২০১০ বিশ্বকাপে টেলিভিশনের পর্দায় তরুণ মেসিকে দেখেই আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে ওঠেন তিনি। আমিরুলের ভাষ্য, মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনার ম্যাচ এখন আর আগের মতো লাগবে না, তবে তিনি যেখানেই খেলুন, তাঁকে সমর্থন করে যাবেন। তাঁর মতে, আর্জেন্টিনার জন্য মেসির অবদান অতুলনীয় এবং তাকে ভোলা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের স্ট্রাইকার জাহিদ হাসান এমিলির কাছে মেসির বিদায় আরও গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। যিনি নিজেও দেশের হয়ে ১৫ গোল করেছেন, তিনি ভালো করেই বোঝেন একজন খেলোয়াড় কীভাবে মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকেন। এমিলি বলেন, গত দুই দশক ধরে মেসি বিশ্ব ফুটবলকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা অনন্য। মেসি ছাড়া আর্জেন্টিনার খেলা দেখতে গেলে অনেকেরই চোখে পানি আসবে বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশের ফুটবলের কিংবদন্তি শেখ মোহাম্মদ আসলাম অবশ্য মেসিকে দেখছেন একজন শিল্পী হিসেবে। আশির দশকের এই স্ট্রাইকারের মতে, মেসির শ্রেষ্ঠত্ব শুধু গোল করার সামর্থ্যে নয়, ফুটবলকে নান্দনিক করে তোলার ক্ষমতায়। তিনি বলেছেন, এমন প্রতিভা যুগে যুগে একবারই আসে। তবে তাঁর আশা, মেসির আদর্শ দেখে আরও দুই-একজন মেসির জন্ম হোক।
অ্যাথলেট মোহাম্মদ ইসমাইলের চোখে মেসি যেন মানুষের চেয়ে বেশি কিছু। শৈশব থেকে মেসির খেলা দেখা ইসমাইল বলেন, মাঝে মাঝে মনে হয় মেসি কোনো এলিয়েন, মানুষ নন। এবারের বিশ্বকাপেও তাঁর পারফরম্যান্সে কোনো ভাটা পড়েনি, যা সত্যিই বিস্ময়কর। দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেকে ধরে রাখাটাই বড় অর্জন, আর সেখানেই মেসি অনন্য।
সাঁতারু সামিউল ইসলাম অবশ্য মেসির অবসরে আরও বড় শূন্যতার কথা বলেছেন। পানিতে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে লড়াই করা এই সাঁতারুর মতে, মেসির মতো কেউ নেই, নেই কোনো তুলনা। এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলার পেছনে তাঁর বড় অবদান। এখন কার খেলা দেখে ভালো লাগবে, কে মেসির মতো আনন্দ দেবে কিংবা কাঁদাবে—এই প্রশ্নই বারবার ফিরে আসে তাঁর মনে।
২০১১ সালে ঢাকায় মেসিকে দেখার সেই স্মৃতি এখনো অনেকের চোখে ভাসে। তখনও বিশ্বকাপ জেতেননি তিনি, সামনে ছিল অজানা পথ। কিন্তু সেই মুহূর্তেই বাংলাদেশিরা বুঝে গিয়েছিলেন, মেসি একদিন ইতিহাস গড়বেন। পরবর্তী সময়ে তিনি জিতেছেন কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ, আর নিজের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে লড়ে গল্পের সমাপ্তি লিখেছেন নিজের মতো করে। বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের কাছে মেসি তাই লড়াইয়ের প্রতীক, ধারাবাহিকতার উদাহরণ এবং নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রেরণা।
মেসির পায়ের জাদু থেমে গেলেও তাঁর গল্প থেমে থাকবে না। নতুন প্রজন্ম তাঁর রেকর্ড নিয়ে আলোচনা করবে, নতুন তারকারা তাঁর জায়গা নেওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু ২০১০ সালে যাকে দেখে বাংলাদেশের এক হকি খেলোয়াড় আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়েছিলেন, ২০১১ সালে যাকে দেখতে স্টেডিয়াম ভরে গিয়েছিল এবং যার বিশ্বকাপ জয়ে দেশের রাস্তায় উল্লাস উঠেছিল—তাকে ভুলে যাওয়া কঠিন, বরং অসম্ভব। কোনো এক ক্লান্ত তরুণ খেলোয়াড় অনুশীলনে ভেঙে পড়লে হয়তো মনে করবেন মেসির কথা, আর সেই অনুপ্রেরণাই হবে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।



