রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পাবনায় এক ব্যতিক্রমী সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। বিকে ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে দেশের আটজন প্রগতিশীল কৃষক ও কৃষি প্রতিষ্ঠানকে 'প্রাকৃতিক কৃষি সম্মাননা ১৪৩৩' দেওয়া হয়। গত ৩১ অক্টোবর পাবনার বেড়া উপজেলার আমিনপুর থানার দয়ালনগর বাহারুন্নেচ্ছা পাবলিক লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে এই অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।
আয়োজক ও বিকে ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এমএ বাতেন খান বলেন, অতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহারের ফলে খাদ্যনিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় প্রাকৃতিক কৃষির প্রসার প্রয়োজন। অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং বিকে ফাউন্ডেশনের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. এসএম আব্দুর রাজ্জাক এক উদ্বেগজনক তথ্যের কথা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, রাসায়নিকের প্রভাবে কৃষকদের মধ্যে ক্যানসারের হার ৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্তদের মধ্যে কৃষকদের হার প্রায় ৬০ শতাংশ।
এই প্রতিযোগিতার বিশেষত্ব ছিল এর মূল্যায়ন পদ্ধতি। সাধারণ কৃষিমেলায় যেখানে উচ্চফলনশীল জাতের জন্য পুরস্কার দেওয়া হয়, সেখানে এখানে বিষমুক্ত ও নিরাপদ ফসল উৎপাদনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। মোট ৪৭ জন আবেদনকারীর মধ্য থেকে দুটি বিভাগে আটজনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। বর্ষসেরা প্রাকৃতিক কৃষি প্রতিষ্ঠানের খেতাব পায় 'কোলে কাপরা কৃষি খামার' এবং বর্ষসেরা প্রাকৃতিক কৃষকের সম্মাননা পান জাতীয় কৃষি পদকপ্রাপ্ত সানোয়ার হোসেন। এছাড়া তিলোত্তমা অর্গানিক কৃষি খামারের স্বত্বাধিকারী জোয়াদার নওশের আলীকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়।
পুরস্কারের হিসেবে বিজয়ীরা ১ লাখ টাকা, প্রথম রানারআপরা ৭৫ হাজার এবং দ্বিতীয় রানারআপরা ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক পুরস্কারের পাশাপাশি সম্মাননা স্মারক লাভ করেন। প্রাকৃতিক কৃষি প্রতিষ্ঠান বিভাগে প্রথম রানারআপ হয় 'চাষবাস' এবং যৌথভাবে দ্বিতীয় রানারআপ হয় 'প্রযত্ন' ও 'দেশি ফার্ম'। অন্যদিকে কৃষক বিভাগে প্রথম রানারআপ হন সুলতানা খাতুন এবং যৌথভাবে দ্বিতীয় রানারআপ হন শাহাদুল ইসলাম ও মোহাম্মদ আলী।
বিজয়ীদের কৃষিচর্চার কথা তুলে ধরে জানা যায়, কোলে কাপরা কৃষি খামার দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ৫৬ বিঘা জমিতে ৭৫ ধরনের পণ্য উৎপাদন করছে। সানোয়ার হোসেন দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে মধুপুর এলাকায় ২৭ ধরনের ফসল চাষ করছেন এবং তা বিদেশেও রপ্তানি করেন। রাজশাহীর সুলতানা খাতুন দুই শতাধিক দেশি বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময়ের পাশাপাশি নারী কৃষকদের সংগঠিত করছেন। এছাড়া চাষবাস, প্রযত্ন এবং দেশি ফার্ম স্থানীয় কৃষকদের নিয়ে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পণ্য উৎপাদন ও বিপণন করছে।
অনুষ্ঠানে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীম মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমির মহাপরিচালক সাইফুল আজম এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ এফ এম জামাল উদ্দিন ও অধ্যাপক ড. আবু নোমান ফারুক আহমেদ এই প্রতিযোগিতার বিচারকমণ্ডলীর দায়িত্ব পালন করেন।
সম্মাননা প্রদানের পাশাপাশি এদিন আমিনপুরের বাঁধের হাটে বিকে ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে 'ইমান আলী খান কৃষি জাদুঘর'-এর উদ্বোধন করা হয়। এই জাদুঘরে প্রাচীন ও আধুনিক কৃষি সরঞ্জাম সংরক্ষণ করা হয়েছে, যাতে মানুষ কৃষির বিবর্তন এবং গ্রামীণ জীবনযাপনের ইতিহাস জানতে পারে। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সাবেক সচিব সেলিম রেজা এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।




