লাল গ্রহ মঙ্গলের অভ্যন্তরে রহস্যময় ভৌগোলিক কর্মকাণ্ড বা সুপ্ত আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তার জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন যে, মঙ্গলের তলদেশ থেকে বিষাক্ত গ্যাস পৃষ্ঠতলে বেরিয়ে আসছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রহটির উপরিভাগে কিছু ফাটল লক্ষ্য করা গেছে, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে গ্রহটির অভ্যন্তরীণ অংশ অতীতে সক্রিয় ছিল এবং সেই সক্রিয়তা বর্তমানকালেও বজায় থাকতে পারে। গবেষণার মূল তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলের গভীরে থাকা ফুটন্ত ম্যাগমা থেকে 'হাইড্রোজেন ক্লোরাইড' গ্যাস নির্গত হচ্ছে, যা সরাসরি আগ্নেয়গিরির কার্যক্রমের ইঙ্গিত দেয়।
এই হাইড্রোজেন ক্লোরাইড গ্যাসের প্রথম আভাস পাওয়া গিয়েছিল ২০২১ সালে, যখন ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA)-এর 'এক্সোমার্স ট্রেস গ্যাস অরবিটার' মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে এর উপস্থিতি শনাক্ত করে। পৃথিবীতে সাধারণত আগ্নেয়গিরির ম্যাগমা তৈরি হওয়ার মুখ বা ভেন্ট দিয়ে এই গ্যাস বের হয়, তাই বিজ্ঞানীরা মঙ্গলের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়ার সম্ভাবনা দেখছেন। সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, মঙ্গলের অভ্যন্তরে এখনও যথেষ্ট তাপ বিদ্যমান, যা অতি অতীতে এবং সম্ভবত বর্তমানেও আগ্নেয়গিরির কার্যক্রমকে সচল রেখেছে। উল্লেখ্য, সৌরজগতের সবচেয়ে বড় আগ্নেয়গিরিগুলো মঙ্গলেই অবস্থিত হলেও সেগুলোর বর্তমান সক্রিয়তার মাত্রা নিয়ে আগে অস্পষ্টতা ছিল। এছাড়া, মঙ্গলের পৃষ্ঠে স্থাপিত সেন্সরগুলোর মাধ্যমে পৃথিবীর ভূমিকম্পের মতো 'মার্সকোয়েক' বা মঙ্গলকম্পের প্রমাণও পাওয়া গেছে।
মঙ্গলের উপরিভাগে এখন পর্যন্ত কোনো প্রত্যক্ষ লাভা প্রবাহ বা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত দেখা না গেলেও, বিজ্ঞানীরা মনে করছেন সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি ভূত্বকের নিচেই ঘটছে। কোনো ম্যাগমা চেম্বার বা লাভা প্রকোষ্ঠ থেকে গ্যাস বাইরে বেরিয়ে আসার এই পদ্ধতিকে গবেষকরা গ্রহটির অভ্যন্তরীণ এক ধরনের 'আগ্নেয় প্লামিং'-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। গবেষক দল মনে করছেন, মঙ্গল গ্রহ যদি এভাবে সক্রিয় থাকে, তবে তা প্রাণের বিকাশের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানির সঙ্গে গরম লাভা মিশলে এমন ক্ষুদ্র পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যেখানে পৃথিবীর মতো অণুজীবের জন্ম ও বিকাশ সম্ভব।
এই গবেষণার যৌথ প্রধান লেখক এবং 'পোলিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস'-এর স্পেস রিসার্চ সেন্টারের অধ্যাপক ড্যানিয়েল মেজ জানান, আলবা মনস অঞ্চলের গ্যাস নির্গত হওয়া ফাটলগুলোতে প্রাণের অনুসন্ধান চালানো অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। তাঁর মতে, সেখানে যদি হাইড্রোথার্মাল বা ভূ-উষ্ণ প্রথা সচল থাকে, তবে তা অণুজীবের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও উপাদান সরবরাহ করতে পারে এবং পৃষ্ঠতলের প্রতিকূল পরিবেশ থেকে তাদের সুরক্ষা দিতে পারে। বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল 'সায়েন্স অ্যাডভান্সেস'-এ 'এনিগম্যাটিক এইচসিএল ডিটেকশনস অ্যাজ এ পটেনশিয়াল সিগনেচার অফ ইগনিয়াস অ্যাক্টিভিটি অন মার্স' শিরোনামে এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।




