মহাকাশের সবচেয়ে রহস্যময় এবং শক্তিশালী বস্তু হিসেবে পরিচিত ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে প্রচলিত ধারণায় পরিবর্তন আনতে পারে এক নতুন গবেষণা। সাধারণত দেখা যায়, দুটি ব্ল্যাকহোল পরস্পরের সাথে সংঘর্ষের পর একীভূত হয়ে আরও বিশাল এক ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়, যা মহাকাশে প্রবল মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সৃষ্টি করে। তবে ইতালির ইউনিভার্সিটি অফ নেপলস ফেদেরিকো টু-এর গবেষক ফ্রান্সেসকো সান্নিনো এবং ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ডেনমার্কের কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি সেন্টারের বিজ্ঞানীদের একটি দল দাবি করেছেন, একটি আস্ত ব্ল্যাকহোল বিভক্ত হয়ে দুটি আলাদা ব্ল্যাকহোলে পরিণত হওয়া সম্ভব।
গবেষকদের মতে, এই বিভাজন প্রক্রিয়াটি হবে অত্যন্ত অদ্ভুত। ব্ল্যাকহোলের যে অদৃশ্য সীমানাকে 'ইভেন্ট হরাইজন' বা ঘটনা দিগন্ত বলা হয়, ভাঙন শুরুর সময় সেটি প্রসারিত হয়ে একটি প্যান্টের আকৃতি ধারণ করবে। এই জ্যামিতিক কাঠামোর কারণেই বিজ্ঞানীরা একে 'পেয়ার-অফ-প্যান্টস টপোলজি' বলে অভিহিত করেছেন। এখানে প্যান্টের উপরের অংশটি হবে মূল ব্ল্যাকহোল এবং নিচের দুটি অংশ থেকে জন্ম নেবে দুটি নতুন ব্ল্যাকহোল। তবে এই বিভাজনের পর নতুন ব্ল্যাকহোল দুটিকে দ্রুত একে অপরের থেকে দূরে সরে যেতে হবে; অন্যথায় মহাকর্ষীয় টানে তারা পুনরায় একীভূত হয়ে যাবে।
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে জটিল দিক হলো পদার্থবিজ্ঞানের তাপগতিবিদ্যার নিয়ম বা এন্ট্রপি। সাধারণত মহাবিশ্বে বিশৃঙ্খলা বা এন্ট্রপি বৃদ্ধি পায়, কিন্তু একটি স্থির ব্ল্যাকহোল ভেঙে দুটি ছোট ব্ল্যাকহোল হলে তাদের মোট এন্ট্রপি কমে যায়, যা বৈজ্ঞানিক নিয়মে অসম্ভব। তবে গবেষকরা দেখিয়েছেন, যদি ব্ল্যাকহোলটি তার সর্বোচ্চ সম্ভাব্য গতিতে লাটিমের মতো তীব্রভাবে ঘুরতে থাকে, তবে ভর, কৌণিক ভরবেগ এবং এন্ট্রপির মধ্যকার চিরাচরিত সম্পর্ক বদলে যায়। এই প্রচণ্ড ঘূর্ণন শক্তির কারণেই এন্ট্রপির বাধা পেরিয়ে ব্ল্যাকহোল বিভক্ত হতে পারে, যদিও শর্ত হলো নতুন সৃষ্ট ব্ল্যাকহোল দুটিকেও একইভাবে দ্রুত ঘুরতে হবে এবং দূরে সরে যেতে হবে।
বাস্তবে এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কোথায়? বিজ্ঞানীরা মনে করেন, গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা দানবীয় ব্ল্যাকহোলগুলোর ক্ষেত্রে এর সম্ভাবনা খুবই কম। তবে মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রারম্ভে তৈরি হওয়া অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও ঘন 'প্রাইমর্ডিয়াল ব্ল্যাকহোল'-এর ক্ষেত্রে এই বিভাজন ঘটার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের বাইরে মহাকর্ষের প্রকৃত কার্যপ্রণালীর ওপর এই ঘটনার সত্যতা নির্ভর করছে। গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে নাসার ফার্মি-ল্যাটের মতো শক্তিশালী গামা-রশ্মি টেলিস্কোপের মাধ্যমে মহাকাশের গভীর থেকে এই ক্ষুদ্র ব্ল্যাকহোলগুলোর আলাদা হয়ে যাওয়ার সংকেত পাওয়া যেতে পারে।




