চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের এক শিশু প্রায় সাত মাস নিখোঁজ থাকার পর রোববার ভোরে নিজ এলাকায় ফিরে এসেছে। কিন্তু ফেরার সময় তার শরীরে ধারণ করা ছিল না স্বাভাবিক অবস্থা — ডান পা কাটা অবস্থায় তাকে পাওয়া যায়। ঘটনার পরপরই পরিবারের সদস্যরা শিশুটিকে নিজেদের তত্ত্বাবধানে নিয়ে যান। বর্তমানে সে তার চাচার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি মাত্র ১০০ টাকা হাতে নিয়ে পরিবারের সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় শিশুটি। সেদিনই একটি নির্বাচনী প্রচারণার ট্রাকে চেপে সে কক্সবাজারে পৌঁছে যায়। ট্রাকে ওঠার সময় ভাড়া দিতে হয়নি তাকে। কক্সবাজারে গিয়ে পর্যটকদের কাছ থেকে টাকা চেয়ে খাবার কেনা চলত তার। রাত কাটাত সমুদ্র সৈকতেই। এভাবে প্রায় দুই মাস কেটে যায়।

এরপর এক পর্যটকের প্রলোভনে পড়ে ঢাকায় যায় সে। পর্যটকটি তাকে ঢাকায় গেলে বেশি টাকা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল বলে শিশুটি জানিয়েছে। ঢাকায় পৌঁছে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় পানি ও শরবত বিক্রির কাজ শুরু করে। বিনিময়ে তিন বেলা খাবার এবং স্টেশনের পাশের একটি ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দেয় একটি চক্র। এভাবে প্রায় এক মাস কাটার পর একদিন ঘুম থেকে উঠে সে নিজেকে হাসপাতালে দেখতে পায় এবং টের পায় তার ডান পা কাটা হয়ে গেছে।

শিশুটির ভাষ্য, তাকে জানানো হয়েছিল ট্রেনে কাটা পড়ায় পা কেটে ফেলতে হয়েছে। তবে পরে তার মনে হয়েছে, ভিক্ষাবৃত্তি করানোর জন্যই পা কেটে নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে প্রায় দুই মাস রাখার পর তাকে একটি হুইলচেয়ার দেওয়া হয়। সেই হুইলচেয়ারে বসে কমলাপুর এলাকায় ভিক্ষা করতে বাধ্য করা হতো তাকে। ভিক্ষা থেকে পাওয়া অর্থও চক্রটি নিয়ে যেত বলে অভিযোগ।

গত শনিবার রাতে চক্রের এক সদস্য তাকে ৩৫০ টাকা দিয়ে লোহাগাড়ার চুনতিতে একটি ধর্মীয় মাহফিলে যেতে বলে। ওই ব্যক্তিই তাকে ঢাকাগামী বাসে তুলে দেয়। এরপর বাসে করে সে চুনতিতে পৌঁছায়। ভোরে মাহফিলে শিশুটিকে দেখতে পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা তার পরিবারকে খবর দেন। খবর পেয়ে ছুটে এসে শিশুটিকে শনাক্ত করেন তার বাবা।

শিশুটির বাবা দিনমজুর। মায়ের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়েছে, তাই শিশুটি বাড়ি থেকে যাওয়ার আগে সৎমায়ের সঙ্গে থাকত। বর্তমানে বাবা-মা দুজনেরই আলাদা সংসার। শিশুটির চাচা জানান, স্থানীয় লোকজনের খবরে গিয়ে দেখা যায় তার ডান পা কাটা, পেটের ডান পাশে ও পেছনে ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, নিখোঁজের পর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে এভাবে পা হারিয়ে ফিরে আসবে, কখনো ভাবেননি কেউ। ঢাকায় নিয়ে গিয়ে তার পা কেটে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

লোহাগাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক জানান, শিশুটি নিখোঁজের পর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো সাধারণ ডায়েরি করা হয়নি। ফলে ঘটনা সম্পর্কে থানা অবগত ছিল না। শিশুটির বাবা থানায় গেলে তাকে মতিঝিল থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ ঘটনাটি ঢাকায় ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট থানা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের পরই ঘটনার প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।