দেশের মোটরসাইকেল শিল্পে নতুন এক সংকট তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি জারি হওয়া শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫-এর কারণে যন্ত্রাংশের বেশ কয়েকটি চালান বন্দরে আটকে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, আমদানি নীতিমালায় নতুন শর্ত যুক্ত হওয়ায় এই জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।

গত বছর ২৪ নভেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে দুই বা তিন চাকার হালকা যানের হর্নের শব্দমাত্রা সর্বোচ্চ ৮৫ ডেসিবেল নির্ধারণ করে সরকার। মাঝারি যানের ক্ষেত্রে সেই সীমা ৯০ ডেসিবেল, আর ভারী যানের জন্য ১০০ ডেসিবেল রাখা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশে ক্রমবর্ধমান শব্দদূষণ রোধ করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৪ আগস্ট জারি হওয়া আমদানি নীতি আদেশে (২০২৬–২৯) নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বিধিমালার নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি শব্দ উৎপন্নকারী হর্ন। এর ফলেই বন্দরগুলোতে মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ আটকে পড়তে শুরু করেছে।

আমদানিকারকদের আশঙ্কা, যন্ত্রাংশ সময়মতো কারখানায় পৌঁছাতে না পারলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেডের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা শাহ মোহাম্মদ আশেকুর রহমান বলেছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় এই ৮৫ ডেসিবেলের সীমা। ফলে বৈশ্বিক বাজারে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ এ দেশে আমদানি করাই কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে প্রায় ১০টি কোম্পানি মোটরসাইকেল সংযোজন ও উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত, যাদের বেশির ভাগ যন্ত্রাংশই বিদেশ থেকে আসে।

এদিকে বাংলাদেশ মোটরসাইকেল এসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব কুমার রায় গত মঙ্গলবার পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আওয়াল মিন্টুর কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। ওই চিঠিতে তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, বর্তমান বিধিমালার মানমাত্রা পুনর্নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে যন্ত্রাংশ আমদানিতে আকস্মিক জটিলতা দেখা দেবে এবং সামগ্রিক শিল্প পরিস্থিতি চরম সংকটে পড়বে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা গবেষণাগারে ২০২২ সালের ১৬ মার্চ ১৩টি ভিন্ন মডেলের মোটরসাইকেলের হর্নের শব্দমাত্রা পরীক্ষা করা হয়েছিল। পরীক্ষায় দেখা যায়, সাত মিটার দূরত্বে শব্দের মাত্রা ছিল সর্বনিম্ন ৮৪ দশমিক ৮ ডেসিবেল থেকে সর্বোচ্চ ৯৯ দশমিক ২ ডেসিবেল। অন্যদিকে শূন্য দশমিক ৫ মিটার দূরত্বে সেই মাত্রা দাঁড়িয়েছিল ১০১ দশমিক ১ থেকে ১১৬ ডেসিবেলের মধ্যে। অর্থাৎ বাজারে প্রচলিত বেশির ভাগ মোটরসাইকেলের হর্নই নতুন নির্ধারিত সীমার বাইরে পড়ে যাচ্ছে।

বিপণনকারীদের দাবি, প্রতিবেশী দেশ ভারতে মোটরযানের হর্নের শব্দমাত্রা ৯৩ থেকে ১১২ ডেসিবেল পর্যন্ত নির্ধারিত। থাইল্যান্ডেও একই মান প্রযোজ্য। এসিআই মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস বলেন, জাপানের মতো শিল্পোন্নত দেশগুলো বাস্তবতা বিবেচনা করেই শব্দসীমা ঠিক করেছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি মাথায় রেখে একটি গ্রহণযোগ্য মান নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, শহরের শব্দদূষণের প্রধান উৎস হলো হাইড্রোলিক হর্ন, যা মোটরসাইকেলে খুব একটা ব্যবহৃত হয় না। সেটির ব্যবহার নিষিদ্ধ করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।

সুব্রত রঞ্জন দাসের মতে, শিল্পখাতে নীতিমালা ঘন ঘন বদলানো কখনোই কাম্য নয়। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনীহা তৈরি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন নিয়ম কার্যকরের আগে শিল্পের সঙ্গে আলোচনা করে সময়সীমা ও মান নির্ধারণ করা উচিত ছিল।