বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশগুলোতে জন্মহার হ্রাস নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। এর কারণ খুঁজতে নানা তত্ত্ব উঠে এসেছে। কেউ বলছেন, সন্তান ধারণের ভয় দেখানো হচ্ছে সমাজে; ফ্রান্সের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, তরুণরা সন্তান নিতে 'ভুলে' যাচ্ছে, তাই ২৯ বছর বয়সীদের চিঠি পাঠিয়ে মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেকের মতে, সন্তান লালন-পালনের খরচই মূল বাধা। তবে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নোবেলজয়ী অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ ক্লডিয়া গোল্ডিন একটি ভিন্ন কারণের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, উচ্চশিক্ষিত ও পরিশ্রমী নারীরা যদি মনে করেন তাঁদের সঙ্গী সন্তান লালন-পালনের কাজে ভাগ বসাবেন না, তাহলে তাঁরা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হারানোর আশঙ্কায় সন্তান নিতে চান না। গোল্ডিন লিখেছেন, “নারীদের নিজেদের শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়বে যদি তারা সন্তান লালন-পালনের পাশাপাশি সেই শিক্ষার আর্থিক ও ব্যক্তিগত সুফল পেতে পারেন। নিশ্চয়তা না পেলে তারা সন্তান না নেওয়ার বা নিজেদের উন্নতিতে বিনিয়োগ না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।” তিনি আরও বলেন, “পুরুষরা যদি বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রমাণ করতে পারেন যে তারা নির্ভরযোগ্য 'বাবা' হবেন, 'ব্যর্থ' নন, তাহলে নারী শিক্ষা ও ক্যারিয়ারে বিনিয়োগ বাড়বে এবং জন্মহারও বাড়বে।” এই তত্ত্বটি সুন্দর হলেও সমালোচনার মুখে পড়েছে। অনেকেই বলছেন, গৃহস্থালির কাজ সমানভাবে ভাগ করে নেওয়ার প্রবণতা বাড়লেও জন্মহার কমছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০০৬ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে গৃহস্থালির কাজে পুরুষদের সময় সামান্য বেড়েছে, আর নারীদের সময় কিছুটা কমেছে। তবুও জন্মহার কমেছে। কেউ কেউ গবেষণার তথ্যের অসঙ্গতিও তুলে ধরেছেন। তবে গোল্ডিন স্বীকার করেছেন, তাঁর গবেষণার সব প্রশ্নের উত্তর তিনি জানেন না। তিনি বলেন, “যখন নারীদের কোনো বিকল্প ছিল না, তখন সন্তান নেওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। এখন তাঁদের হাতে বিকল্প আছে।” পুরুষদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য বলে মনে করেন তিনি। নিজের ক্লাসের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তিনি ভালো বাবা কারা তা আঁচ করতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন এই অর্থনীতিবিদ। গোল্ডিনের এই গবেষণা ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। গুগলে তাঁর নামের খোঁজ গত এক বছরে ৪০০ শতাংশ বেড়েছে। জন্মহারের বিষয়টি এখন রাজনীতির এজেন্ডাতেও উঠে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমনকি বলেছেন, তিনি 'ফার্টিলাইজেশন প্রেসিডেন্ট' হিসেবে পরিচিত হতে চান, কারণ তিনি আইভিএফের সুযোগ বাড়ানোর মতো নীতি গ্রহণ করেছেন। গোল্ডিনের তত্ত্বের ভিত্তি কিন্তু নতুন কিছু নয়। গত ৫০ বছর ধরে নারীরা শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী সাম্প্রতিক উচ্চ বিদ্যালয় স্নাতকদের মধ্যে ৬৯.৫ শতাংশ নারী কলেজে ভর্তি হয়েছেন, যেখানে পুরুষের হার ৫৫.৪ শতাংশ। ১৯৭৪ সালে কলেজে ভর্তি হওয়া ১৪-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে নারী ছিলেন ৪৫.৮৭ শতাংশ। শুধু পছন্দ নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনেও নারীদের কাজে যেতে হচ্ছে। ব্রুকিংসের ২০২০ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের আয় না থাকলে ১৯৭৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে মধ্যবিত্ত পরিবারের আয় প্রায় শূন্য থাকত। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও শ্রম অর্থনীতিবিদ মাইরা স্ট্রোবার মনে করেন, এর সমাধান সহজ ও বিস্তৃত। তাঁর মতে, সন্তানের প্রয়োজন এখন পরিবার থেকে সমাজে স্থানান্তরিত হয়েছে। “আগে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে কাজ করার জন্য সন্তানের প্রয়োজন হতো। শিশুমৃত্যুর হার বেশি থাকায় অনেক সন্তান নেওয়া হতো। এখন কৃষির গুরুত্ব কমেছে, শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, তাই মানুষের আর আগের মতো সন্তানের প্রয়োজন নেই,” বলেন স্ট্রোবার। স্ট্রোবার ও তাঁর সহ-লেখক অ্যাবি ডেভিসন ২০২৩ সালে 'মানি অ্যান্ড লাভ' বইটি লিখেছেন, যা এখন স্ট্যানফোর্ডের বিজনেস স্কুলে পড়ানো হয়। ডেভিসন বলছেন, কর্মক্ষেত্র ও সংস্কৃতির প্রত্যাশা না বদলালে শুধু নীতি পরিবর্তনে কাজ হবে না। “সাংস্কৃতিক আলোচনা জরুরি। সেরা নীতি থাকলেও, সংস্কৃতি ও সন্তান লালন-পালনের খরচ না বদলালে ব্যক্তিপর্যায়ে আচরণের পরিবর্তন দেখা যাবে না,” বলেন তিনি। স্ট্রোবার বলেন, “আমাদের শোবার ঘরের নীতি নয়, সামগ্রিক অর্থনীতি ও জননীতি নিয়ে ভাবতে হবে।” গোল্ডিন, স্ট্রোবার ও ডেভিসন সবাই মনে করেন, নারী-পুরুষের সমতা জরুরি। স্ট্রোবার প্রশ্ন তুলেছেন, “পুরুষ ও নারীদের মধ্যে প্রতিভা ও সৃজনশীলতা বণ্টিত আছে, তাহলে কেন সমাজ চালাতে উভয়ের সেরাটা ব্যবহার করা হবে না?” ডেভিসন, যিনি দুই ছেলের মা, তিনি বলেন, তাঁর ছেলেরা বাবাকে রান্নাঘরে দেখে বড় হচ্ছে, এটা স্বাভাবিক মনে করবে তারা। এটি কর্মক্ষেত্র ও নাগরিক উভয়ের জন্যই মূল্যবান।
নারীদের সন্তানধারণে ‘সহযোগী স্বামী’র ভূমিকা: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের নতুন তত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক
হার্ভার্ডের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ক্লডিয়া গোল্ডিনের মতে, উচ্চশিক্ষিত নারীরা সন্তান নিতে চান না কারণ তাঁদের ধারণা, সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব ভাগ করে নেবেন না তাঁদের সঙ্গীরা। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গৃহস্থালির কাজে সমতা এলেও জন্মহার কমছে, তাই এই তত্ত্ব পুরোপুরি সঠিক নয়।




