জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত অর্থনীতির অধ্যাপক স্টিভ হ্যাঙ্কে, যিনি 'মানি ডক্টর' নামে পরিচিত, সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন সরকারকে মুদ্রানীতি সংস্কারে পরামর্শ দেওয়া এই অর্থনীতিবিদ এখন ভেনেজুয়েলার প্রচণ্ড মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় কাজ শুরু করেছেন। তার প্রস্তাবিত সমাধানটি বেশ মৌলিক — দেশটির নিজস্ব মুদ্রা বোলিভার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিত্যাগ করে সম্পূর্ণরূপে মার্কিন ডলার গ্রহণ করা। ফরচুন ম্যাগাজিনের সাংবাদিক শন টালির সাথে এক সাক্ষাৎকারে হ্যাঙ্কে এই পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।

তার মতে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই ভেনেজুয়েলার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার মূল চাবিকাঠি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের ব্যয় মেটাতে অতিরিক্ত মুদ্রা ছাপালে দাম আরও বেড়ে যায়, আর এই ঝুঁকি দূর করাই ডলার চালুর মূল লক্ষ্য। হ্যাঙ্কে বলেন, “মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই ভেনেজুয়েলার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার মূল চাবিকাঠি। স্থিতিশীলতা মানে শুধু স্থিতিশীল মূল্য নয়, এটি ছাড়া সবকিছু অর্থহীন। আর এই সত্য প্রমাণের জন্য ভেনেজুয়েলার চেয়ে ভালো উদাহরণ আর নেই।”

এই পরামর্শ নতুন নয়, কারণ হ্যাঙ্কের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। ১৯৯৯ সালে তিনি মন্টিনিগ্রোকে যুগোস্লাভ দিনার বাদ দিয়ে ডয়েচেমার্ক গ্রহণে রাজি করান। তারপর ২০০০ সালে ইকুয়েডরকে সুক্রে থেকে ডলারে নিয়ে যাওয়ার তদারকি করেন, যা গত এক শতাব্দীতে লাতিন আমেরিকায় প্রথম ডলারাইজেশন ছিল। এরপর ২০০৯ সালে জিম্বাবুয়ের প্রধানমন্ত্রীর অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন; সেখানে ডলার চালুর ফলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এলেও ২০১৩ সালে নতুন সরকার ডলার বাদ দিলে হাইপারইনফ্লেশন ফিরে আসে।

ভেনেজুয়েলায় এটি তার দ্বিতীয় প্রচেষ্টা। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি তার কারেন্সি বোর্ড পরিকল্পনা জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তবে এবার তিনি বেশ আশাবাদী; তার অনুমান, ডলারাইজেশন প্রস্তাব অনুমোদনের সম্ভাবনা ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ। তিনি মনে করেন, ১৯৯৯ সালে ইউরো চালুর পর থেকে কোনো দেশের নিজস্ব মুদ্রা বাদ দিয়ে বিকল্প মুদ্রা গ্রহণের ঘটনা এটি সবচেয়ে বড় হতে পারে।

উল্লেখ্য, এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার আগেই ভেনেজুয়েলার বাস্তবে ডলার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বোলিভারের মান গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে ৭৮ শতাংশ কমে যাওয়ায় দেশটির সাধারণ মানুষ প্রায় প্রতিটি কেনাকাটায় ডলার ব্যবহার করছে। সরকারি চাকরিজীবী এবং সরকারের কাছ থেকে ভাতা বা পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা ছাড়া প্রায় সবাই ডলারে লেনদেন করছে। হ্যাঙ্কের ভাষায়, এই 'স্বতঃস্ফূর্ত ডলারাইজেশন' আনুষ্ঠানিক মুদ্রা পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে।

তবে সবচেয়ে বড় বাধা হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক হারানোর ঝুঁকি, যা শেষ মুহূর্তের ঋণদাতা হিসেবে কাজ করে। তাছাড়া মুদ্রানীতি কার্যত ফেডারেল রিজার্ভের হাতে চলে যাবে, এটাও অনেকের জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়। এমনকি আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই, যিনি নির্বাচনে ডলারাইজেশনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় আসার পর এই ধারণা থেকে সরে আসেন। তিনি ভর্তুকি ও বাজেট ঘাটতি কমানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমালেও বাৎসরিক হার এখনও অনেক বেশি। ডলারের সাথে পেসোর বিনিময় হার ধরে রাখতেও আর্জেন্টিনাকে সংগ্রাম করতে হচ্ছে; গত বছর আঞ্চলিক নির্বাচনে মিলেইর দলের পরাজয়ের পর পেসোর মান ধসে পড়লে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট কারেন্সি সোয়াপ লাইন দিয়ে সহায়তা করেন।

তা সত্ত্বেও হ্যাঙ্কে বিশ্বাস করেন, ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির চাবিকাঠি হলো ডলারাইজেশন। তেল রপ্তানির উপর অত্যন্ত নির্ভরশীল এই অর্থনীতিতে মুদ্রা পরিবর্তন হলে তেল খাতে বিদেশি বিনিয়োগের একটি বড় ঢেউ আসবে বলে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন। এছাড়া ভেনেজুয়েলার প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ রয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ১৫০ শতাংশ। তার মতে, উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে এই ঋণের মূল ও সুদ পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় ডলার আসবে। হাইপারইনফ্লেশন শেষ হলে সুদের হার কমবে, ফলে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়বে; এটি আবাসন খাতকে চাঙা করবে এবং অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। হ্যাঙ্কে বলেন, “যদি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে ভেনেজুয়েলা এই বছর নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি থেকে পরের বছর ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ফিরে যেতে পারে।”