যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরা এখন কৃষিজমির দিকে ঝুঁকছেন। কেউ কেউ নিজেদের বিলাসবহুল শখ পূরণে এই জমি ব্যবহার করছেন, আবার অনেকে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে কিনছেন। তবে কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই ধনকুবেরদের জমি কেনার প্রতিযোগিতা প্রকৃত কৃষকদের জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
মেটা প্ল্যাটফর্মের প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ এবং রেডিটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেক্সিস ওহানিয়ানের মতো উদ্যোক্তারা নিজেদের শখের কৃষক হিসেবে পরিচিতি দিচ্ছেন। সম্প্রতি এক পডকাস্টে জাকারবার্গ জানান, তিনি হাওয়াইয়ের কাউয়াই দ্বীপে নিজের খামারে ওয়াগু ও অ্যাঙ্গাস গবাদি পশু লালন-পালন করে নিখুঁত স্টেক তৈরি করতে চান। কোওলাউ রাঞ্চ নামের এই সম্পত্তিটি ২০১৪ সালে কেনা শুরু করেন তিনি, যা এখন প্রায় ৪,০০০ একর জুড়ে বিস্তৃত এবং যার মূল্য আনুমানিক ৩০ কোটি ডলার। অন্যদিকে, ওহানিয়ান সম্প্রতি ফ্লোরিডার জুপিটার শহরে তার পারিবারিক খামারের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেছেন, যেখানে কলাগাছ, ভেষজ বাগান ও মৌমাছির চাষ দেখানো হয়েছে।
তবে এই উদ্যোগগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট। ২০২৫ সালের ল্যান্ড রিপোর্ট অনুযায়ী, মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের মালিকানায় ২ লাখ ৭৫ হাজার একর জমি রয়েছে। অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের আছে ৪ লাখ ৬২ হাজার একর, আর স্ট্যান ক্রোয়েঙ্কের মালিকানায় রয়েছে ২৭ লাখ একর জমি। জাকারবার্গ বা ওহানিয়ান কেউই শীর্ষ ১০০ জমির মালিকের তালিকায় স্থান পাননি।
পিপলস কোম্পানির প্রেসিডেন্ট স্টিভ ব্রুয়ার জানান, কৃষিজমি এখন ৪.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের একটি বড় বিনিয়োগ খাতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ধনীদের কাছে এটি মূল্যস্ফীতি ও বাজারের ওঠানামার বিরুদ্ধে সুরক্ষার মাধ্যম হয়ে উঠেছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি একর কৃষিজমির গড় মূল্য ছিল প্রায় ৪,৩৫০ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৪.৩ শতাংশ বেশি। কিন্তু এই চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমির দামও বেড়ে যাচ্ছে, যা প্রকৃত কৃষকদের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করছে।
ন্যাশনাল ইয়াং ফার্মার্স কোয়ালিশনের নীতি প্রচারণা পরিচালক এরিন ফস্টার ওয়েস্ট বলেন, উচ্চ মূল্যের কারণে নতুন কৃষকরা প্রথম জমি কেনা বা বিদ্যমান কৃষকরা খামার সম্প্রসারণ করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রায় ২০ বছর আগে ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর বিনিয়োগকারীরা বিকল্প নিরাপদ বিনিয়োগের খোঁজে কৃষিজমির দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। ১৯৭০-এর দশকের মতোই মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা পেতে তারা এই বাস্তব সম্পদে বিনিয়োগ করছেন।
ব্রুয়ার বলেন, যারা বিনিয়োগে বৈচিত্র্য ও মূল্যস্ফীতি থেকে সুরক্ষা চান, তাদের জন্য কৃষিজমি একটি ভালো বিকল্প। বিশ্বে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রতি বছর কমছে বলে এর মূল্য আরও বাড়বে বলেও তিনি মত দেন। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় ডেটা সেন্টার তৈরির জন্যও জমির চাহিদা বাড়ছে। তবে ধনীদের জন্য জমির বিনিয়োগের বাইরেও ব্যক্তিগত আনন্দের বিষয় রয়েছে। জাকারবার্গ ও ওহানিয়ানের মতো অনেকেই এখন জমিতে হাঁটা, মাছ ধরা, শিকার ও খাবার উৎপাদনের মতো সুবিধাগুলো উপভোগ করছেন, যা কোভিড মহামারির সময় ঘরবন্দি থাকার পর বেড়েছে।
এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষিজমি কৃষকদের কাছে লিজ দেওয়া হচ্ছে। নতুন কৃষকদের জন্য জমি ভাড়া নেওয়া ক্ষতিকর নাও হতে পারে। তবে জমির দামের তুলনায় ভাড়ার হার কম বাড়ছে। তবুও লিজ নেওয়ার অর্থ হলো জমির ওপর কৃষকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে মাটির গুণাগুণ উন্নয়ন বা দীর্ঘমেয়াদি কৃষি পরিকাঠামো তৈরিতে বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ওয়েস্টের মতে, সমস্যা তখনই প্রকট হয়, যখন কৃষকরা জমি কেনার প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে বাধ্য হয়ে ভাড়াটিয়া হচ্ছেন। এতে তারা জমি বন্ধক রেখে ব্যবসার ঋণ নিতে পারছেন না, সন্তানদের কলেজের খরচ বা নিজের অবসরের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে পারছেন না। কৃষক হিসেবে সফল হতে হলে জমির মালিকানা থাকা খুবই জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।




