মহামারী-পরবর্তী উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা প্রশমিত হলেও, ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মুদি দোকানের পণ্যের দাম এখনো ঊর্ধ্বমুখী। ভোক্তাদের মাঝে এই নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ বিরাজ করছে। মূলত কয়েকটি জটিল কারণ একসাথে কাজ করছে — এর মধ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্কনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং আবহাওয়া ও খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা। এছাড়াও শ্রমিক সংকট, বেড়ে যাওয়া মজুরি এবং মেক্সিকান টমেটো চুক্তি স্থগিতের মতো বাণিজ্য নীতির পরিবর্তনও দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চরম আবহাওয়া, শ্রমিক সংকট এবং উচ্চ জ্বালানি ও পরিবহন খরচের কারণে তাজা সবজির দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। প্রশাসনের বাণিজ্যনীতিও এই বৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে দেশটিতে খাদ্য বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল।
নীতিনির্ধারকরা দ্রুত কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তবে তা অনেক সময়ই অপর্যাপ্ত ও বিতর্কিত হয়ে উঠছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র গ্রাউন্ড বিফের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। এর মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান খাদ্যমূল্যে ভোগান্তিতে থাকা ভোক্তাদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু অন্যদিকে গরুর মাংস উৎপাদনকারীরা উচ্চ মূল্যে লাভবান হচ্ছেন। কানসাস সিটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গরুর মাংসের চাহিদা ক্রমাগত বেশি থাকায় এবং সরবরাহ কম থাকায় আগামী মাসগুলোতেও এর উচ্চ মূল্য বহাল থাকতে পারে।
বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণ কিন্তু এক নয়। মুদি দোকানের প্রতিটি বিভাগে এই কারণ ভিন্ন। ফ্লোরিডায় অকাল ও দেরিতে তুষারপাতের ফলে শাকসবজির দাম বেড়েছে। স্ট্রবেরি বা শাকের মতো ফসল চাষে প্রচুর শ্রমের প্রয়োজন হয়, কিন্তু শ্রমিক সংকটের কারণে খামারগুলোকে মজুরি বাড়াতে বাধ্য হতে হয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জ্বালানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় এবং অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ায় তেল ও সারের দামও বেড়েছে, যা খাদ্য উৎপাদন খরচের ওপর প্রভাব ফেলছে।
কৃষি খাত সবসময়ই কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ, তবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো এখন সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে শীত ও বসন্তের শুরুতে তাজা পণ্যের জন্য আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হয়। দেশীয় টমেটো শিল্পকে রক্ষা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকান টমেটো আমদানির একটি বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের মোট টমেটো সরবরাহের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই আমদানি থেকে আসে, তাই এই সিদ্ধান্ত বাজারকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এই সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হচ্ছে ক্রেতাদেরই।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোক্তা জরিপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে অর্থনৈতিক আশাবাদ সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। মূলত জ্বালানির দাম না কমা পর্যন্ত ভোক্তাদের আস্থা ফিরবে না বলেও জানানো হচ্ছে। বয়স্ক, কম আয়ের মানুষ এবং কলেজ ডিগ্রি নেই এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এই নেতিবাচক ধারণা আরও প্রকট। খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিম্ন আয়ের মানুষের বাজেটে সবচেয়ে বড় চাপ সৃষ্টি করছে, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন অনেক পরিবারের জন্য খাদ্য সহায়তা সুবিধাও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতি ৫ জন ক্রেতার মধ্যে ১ জন এখন তাজা পণ্যের বদলে হিমায়িত পণ্য কিনছেন। তবে সাশ্রয়ী হওয়ায় সবজির ক্ষেত্রে বিকল্প আছে। গরুর মাংসের বদলে মুরগি, ডিম বা ডালের মতো বিকল্প প্রোটিনের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল।
খাদ্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতি দেশটির কৃষকদের বাজারের জন্য সুবিধাই হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ স্থানীয় উৎপাদকরা ওপরের খরচের চাপে তেমন পড়েননি। অনেকে কৃষকদের বাজারকে কিছুটা দামি মনে করলেও, সেখানে ভালো দামে পণ্য কেনার সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি উৎপাদন হলে অনেকে আবার পাইকারি দামও দেন। তাছাড়া বিভিন্ন কৃষক বাজার খাদ্য সহায়তা গ্রহীতাদের জন্য ভাউচার ও ছাড়ের সুবিধাও দিচ্ছে।
খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে যতগুলো কারণ কাজ করছে, তাতে এটা স্পষ্ট যে এই সমস্যার কিছু অংশ দীর্ঘমেয়াদী এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সাথে জড়িত। তবে খাদ্যের দাম নিয়ে ভোক্তাদের এই উদ্বেগ দেশীয় উৎপাদকদের সমর্থন এবং আমদানি-নির্ভর সাশ্রয়ী খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার বিষয়ে জাতীয় আলোচনাকে আরও জোরদার করতে পারে।




