মালয়েশিয়ার ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নেশনগেট সম্প্রতি ফরচুন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ৫০০-এর তালিকায় অভিষেক ঘটিয়েছে। আর এই তালিকায় রাজস্ব বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি — ৭২০ শতাংশেরও ওপরে — যা সম্ভব হয়েছে মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের ব্যাপক প্রসারের কারণে। জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টার স্থাপনে বিনিয়োগের ঢল নেমেছে, আর সেই বিনিয়োগের একটা বড় অংশ পেয়েছে মালয়েশিয়া। গত ১৮ মাসে গুগল, ওরাকল ও মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মালয়েশিয়ায় বহু বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে, যার সুফল পেতে শুরু করেছে দেশটির স্থানীয় কোম্পানিগুলোও।

গত বছর নেশনগেটের মোট রাজস্ব দাঁড়িয়েছিল ৫.২৭ বিলিয়ন রিঙ্গিত, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন। এই অঙ্কের ভিত্তিতে ফরচুনের ওই আঞ্চলিক তালিকায় প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ২৪৩তম। এর পাশাপাশি কোম্পানিটির মুনাফাও আগের বছরের তুলনায় ১৬৩ শতাংশ বেড়ে ৩৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আয়ের সিংহভাগ — প্রায় ৮৮ শতাংশ — এসেছে প্রতিষ্ঠানটির ডেটা কম্পিউটিং বিভাগ থেকে, যেখানে ২০২৩ সালে এই খাতের অবদান ছিল মাত্র ১৭ শতাংশ। তবে শুধু ডেটা খাতেই সীমাবদ্ধ নয় নেশনগেট; স্বয়ংচালিত এবং টেলিযোগাযোগ শিল্পের জন্যও যন্ত্রাংশ ও সেবা সরবরাহ করে তারা।

নেশনগেটের ব্যবসার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছে এআই পণ্য একত্রিতকরণ। এই খাতে তাদের রয়েছে একটি কৌশলগত সুবিধা — দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এনভিডিয়ার একমাত্র অরিজিনাল ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং (ওইএম) অংশীদার তারা। অর্থাৎ, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এআই সার্ভার তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় এনভিডিয়ার গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) একত্রিত করার কাজ এই অঞ্চলে একমাত্র নেশনগেটই করতে পারে। উচ্চ-কার্যক্ষমতার এআই অ্যাপ্লিকেশনগুলোতে এনভিডিয়ার জিপিইউ-র ব্যবহারই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, এআই খাতে তারা 'অপরিসীম সম্ভাবনা' দেখতে পাচ্ছে এবং এআই সার্ভার উৎপাদনে তাদের প্রবেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ বিশ্বব্যাপী ডেটা সেন্টার বিনিয়োগের 'দ্বৈত অঙ্কের' বার্ষিক প্রবৃদ্ধি কাজে লাগাতে সহায়তা করবে।

তবে এই এআই-বুমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু ঝুঁকিও। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর — উভয় দেশই মার্কিন নিয়ন্ত্রিত চিপ চীনে পাচারের চ্যানেল হওয়ার অভিযোগের মুখে পড়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা খতিয়ে দেখছেন যে, চীনা এআই স্টার্টআপ ডিপসিক সিঙ্গাপুরের তৃতীয় পক্ষের সহায়তায় মার্কিন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এড়িয়ে গেছে কি না। এছাড়া গত মার্চে সিঙ্গাপুরের আইন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কে শানমুগাম জানান, মার্কিন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণাধীন চিপ সম্বলিত সার্ভার মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী টেংকু জাফরুল আবদুল আজিজ জানান, তদন্ত চলছে এবং প্রতারণায় জড়িত স্থানীয় কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আরও একটি উদ্বেগ ছিল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যেন এআই চিপ কেনার ক্ষেত্রে মার্কিন নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকে — যদিও গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন সেই প্রস্তাবটি বাতিল করে দিয়েছে।

এসব তদন্তের সঙ্গে নেশনগেটের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে প্রতিষ্ঠানটি স্পষ্ট করলেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শঙ্কা কাটেনি। এর ফলশ্রুতিতে চলতি বছরে নেশনগেটের শেয়ারের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে।