দইকে উপকারী অণুজীবের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষত প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ দই পরিপাকতন্ত্রের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তবে বাজারে পাওয়া বেশিরভাগ দইয়ে স্বাদ বাড়াতে অতিরিক্ত চিনি যুক্ত করা হয়। এতে একটি সাধারণ প্রশ্ন দেখা দেয়—মিষ্টি দইয়ে কি আদৌ প্রোবায়োটিক থাকে? আর চিনি কি সেই উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোকে ধ্বংস করে ফেলে? এই বিষয়টি নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করা যাক।
দই প্রস্তুতির প্রক্রিয়া বোঝা গেলে চিনির প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। দুধের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু জীবিত ব্যাকটেরিয়া গাঁজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দই তৈরি করে। ল্যাক্টোব্যাসিলাস বুলগারিকাস এবং স্ট্রেপ্টোকক্কাস থার্মোফিলাস—এই দুই ধরনের ব্যাকটেরিয়া দুধের প্রাকৃতিক শর্করা ল্যাকটোজকে গাঁজন করে ল্যাকটিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত করে। ফলে দুধ ঘন হয় এবং দইয়ে টক স্বাদ সৃষ্টি হয়। এই গাঁজন প্রক্রিয়ায় ল্যাকটোজ ব্যাকটেরিয়ার শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে।
দুধে স্বাভাবিকভাবে বিদ্যমান ল্যাকটোজ এবং দইয়ে পরবর্তীকালে যুক্ত করা চিনি—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। গাঁজনের সময় ব্যাকটেরিয়া ল্যাকটোজ ভেঙে ল্যাকটিক অ্যাসিড উৎপন্ন করে, যার ফলে দুধের তুলনায় দইয়ে ল্যাকটোজের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। অন্যদিকে, অনেক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গাঁজন সম্পন্ন হওয়ার পরে দইয়ে অতিরিক্ত চিনি মেশায়, যা শুধুমাত্র মিষ্টতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের পাবএমইডিতে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, দইয়ে যোগ করা চিনি জীবিত ব্যাকটেরিয়াকে সরাসরি ধ্বংস করে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের সঙ্গে অন্ত্রের অণুজীবের গঠন ও ভারসাম্যের পরিবর্তনের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া গেছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, চিনি প্রোবায়োটিক নষ্ট করে না। ফ্রিজে সংরক্ষণের সময় চিনির উপস্থিতির কারণে প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া দ্রুত মারা যায়—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে সংরক্ষণের দীর্ঘ সময়ে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কিছুটা কমতে পারে, যা মূলত ব্যাকটেরিয়ার ধরন, দইয়ের গঠন এবং সংরক্ষণের তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে।
ঠান্ডা তাপমাত্রায় এসব ব্যাকটেরিয়া সাধারণত নিষ্ক্রিয় বা অত্যন্ত ধীরগতিতে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু দইয়ে চিনির পরিমাণ অত্যধিক হলে 'অসমোটিক স্ট্রেস' নামক একটি অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। এই অবস্থায় ব্যাকটেরিয়ার কোষের বাইরে চিনির ঘনত্ব হঠাৎ বৃদ্ধি পায়, যার ফলে কোষের অভ্যন্তর থেকে পানি বেরিয়ে গিয়ে কোষের উপর চাপ সৃষ্টি হয়। এর অর্থ এই নয় যে ব্যাকটেরিয়াগুলো সম্পূর্ণ মারা গেছে, তবে অন্ত্রে পৌঁছানোর সময় অতিরিক্ত চিনির প্রভাবে কিছু প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া পূর্বের তুলনায় কম সক্রিয় থাকতে পারে।
প্রকৃত উদ্বেগের বিষয় হলো চিনি সরাসরি দইয়ের প্রোবায়োটিক ধ্বংস করে কি না, তা নয়; বরং অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের সামগ্রিক প্রভাবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অন্ত্রে অসংখ্য অণুজীব বাস করে, যার মধ্যে উপকারী ও ক্ষতিকর উভয় ধরনের ব্যাকটেরিয়াই বিদ্যমান। অন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখার জন্য এই দুই শ্রেণির মধ্যে ভারসাম্য অত্যন্ত জরুরি। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত যোগ করা চিনির সঙ্গে অন্ত্রের অণুজীবের গঠন ও বৈচিত্র্যের পরিবর্তন সম্পর্কিত, তবে ফলাফল সব ক্ষেত্রে অভিন্ন নয়।
অন্ত্রের অণুজীবগুলোর জন্য খাদ্য ও স্থান সীমিত। ক্ষতিকর অণুজীব দ্রুত বৃদ্ধি পেলে খাদ্য ও বসবাসের জায়গার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। ফলে প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রে পৌঁছালেও যদি অনুকূল পরিবেশ না পায়, তাহলে তাদের কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে।
তাই প্রশ্ন উঠতে পারে—মিষ্টি দই কি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া উচিত? শুধুমাত্র চিনির উপস্থিতির কারণে মিষ্টি দইকে প্রোবায়োটিকহীন বা অস্বাস্থ্যকর বলা যুক্তিসঙ্গত নয়। কোনো দইয়ে প্রোবায়োটিক আছে কি না, তা নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের উপর: প্রথমত, দইয়ে কোন নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার স্ট্রেইন বা ধরন রয়েছে; দ্বিতীয়ত, সেই ব্যাকটেরিয়া কত পরিমাণে উপস্থিত; তৃতীয়ত, সংরক্ষণকাল জুড়ে সেগুলো জীবিত থাকে কি না।
একটি অণুজীবকে প্রোবায়োটিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হলে চারটি শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রথমত, অণুজীবটির ধরন এবং স্ট্রেইন স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা আবশ্যক। দ্বিতীয়ত, খাদ্য বা খাদ্য সম্পূরকে ব্যবহারের জন্য এটি নিরাপদ হতে হবে। তৃতীয়ত, মানুষের উপর পরিচালিত অন্তত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এর স্বাস্থ্যগত উপকারিতা প্রমাণিত হতে হবে। চতুর্থত, পণ্যের মেয়াদকাল জুড়ে কার্যকর পরিমাণে অণুজীবটি জীবিত থাকতে হবে। সুতরাং, কোনো খাবারে জীবিত ব্যাকটেরিয়া থাকলেই সেটি প্রোবায়োটিক হিসেবে গণ্য হয় না।
পরিশেষে বলা যায়, দইয়ে চিনি থাকার কারণে প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া নষ্ট হয়ে যায় না। তবে নিয়মিত অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের অভ্যাস অন্ত্রের অণুজীবের ভারসাম্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। স্বাস্থ্যকর দই নির্বাচনের সময় চিনির পরিমাণ এবং প্রোবায়োটিক স্ট্রেইনের উপস্থিতি যাচাই করা বুদ্ধিমানের কাজ।




