যুক্তরাষ্ট্রের মিডটার্ম নির্বাচনে এখন পর্যন্ত শীর্ষ ১০ ধনী দাতা এককভাবে ৭৩৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছেন বলে ফেডারেল নির্বাচনী রেকর্ডে দেখা গেছে। মার্ক আন্দ্রেসেন, এলন মাস্ক, জর্জ সোরোস এবং উইঙ্কলভস টুইনসহ খ্যাতনামা কোটিপতিরা ফেডারেল নির্বাচনী দৌড়ে কয়েক মিলিয়ন ডলার ঢেলে দিয়েছেন। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্টের তৈরি করা তালিকা অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনী চক্রে শীর্ষ ব্যক্তিগত দাতাদের প্রায় সবাই কোটিপতি অথবা তাদের নিয়ন্ত্রিত কোম্পানি। এছাড়া রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটপন্থী অলাভজনক সংস্থা, ক্রিপ্টো কোম্পানি কয়েনবেস ও ক্রিপ্টো.কম এবং স্পোর্টস বেটিং সাইট ড্রাফটকিংসও শীর্ষ দাতাদের তালিকায় রয়েছে।

ফোর্বসের মূল্যায়ন অনুযায়ী ১.৯ বিলিয়ন ডলারের মালিক মার্ক আন্দ্রেসেন এবং তার ব্যবসায়িক অংশীদার বেন হোরোইতস ও তাদের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড আন্দ্রেসেন হোরোইতস মিলিয়ে এবার নির্বাচনী চক্রে ১১৫.৩ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। আন্দ্রেসেন নিজে ব্যক্তিগতভাবে প্রায় ৪২.২ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন, যার সবচেয়ে বড় অংশ গেছে ক্রিপ্টো ও এআই-পন্থী পিএসি এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের MAGA ইনকর্পোরেটেডে। অন্যদিকে জর্জ সোরোস ও তার ছেলে অ্যালেক্স মিলে ডেমোক্র্যাটপন্থী সুপার পিএসিগুলোতে ১০৩.৭ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। তবে সোরোস নিজে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও ডেমোক্র্যাটিক সিনেটরিয়াল ক্যাম্পেইন কমিটিতে মাত্র এক মিলিয়ন ডলারের কম দিয়েছেন।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত জেফ ইয়াস, যিনি আগে টিকটক সমর্থন করেছিলেন, তিনি এ পর্যন্ত ৯৩.৮ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। এর মধ্যে ২০ মিলিয়ন ডলার গেছে কোটিপতি ভিভেক রামাস্বামীর ওহাইও গভর্নর পদপ্রার্থীকে সমর্থনকারী সুপার পিএসিতে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি এলন মাস্ক তার নিজের আমেরিকা পিএসিতে প্রায় ৯০.৫ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। জানা গেছে, এই বছর ব্যাটলগ্রাউন্ড সিনেট ও হাউস নির্বাচনে ১২০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের অনুমোদন পেয়েছে সংস্থাটি। রিপাবলিকানদের বড় দাতা হিসেবে পরিচিত রিচার্ড ও এলিজাবেথ উইহলিন দম্পতি এবার যৌথভাবে ৭০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। তাদের অর্থ গেছে বিচার বিভাগীয় নির্বাচন এবং উইসকনসিনের হাউস প্রার্থী জেসি এবেনকে সমর্থনকারী তহবিলে, যদিও এবেন শেষ পর্যন্ত প্রাইমারিতে হেরে গেছেন। প্রয়াত ক্যাসিনো মোগল শেলডন অ্যাডেলসনের স্ত্রী মিরিয়াম অ্যাডেলসন প্রায় ৬৭.৬ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন, যার মধ্যে ২৫ মিলিয়ন গেছে ট্রাম্পের MAGA ইনকর্পোরেটেডে এবং ৪০ মিলিয়ন গেছে হাউস ও সিনেট রিপাবলিকানদের সমর্থনে।

রিপল ল্যাবসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস লারসেন এবং তার কোম্পানি মিলিয়ে ৬৫.৭ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন, যার মধ্যে লারসেন নিজে ১৫.২ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। রিপলের অর্থ মূলত ফেয়ারশেক সুপার পিএসিতে গেছে, যা ক্রিপ্টো-বান্ধব প্রার্থীদের সমর্থন করে। দীর্ঘদিনের ডেমোক্র্যাট দাতা লারসেন পরিচ্ছন্ন শক্তি পিএসি এবং ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদেরও উদারভাবে দান করেছেন। রিপাবলিকানপন্থী দাতা পল সিঙ্গার এ পর্যন্ত ৫২.৫ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন, যার মধ্যে ১৫ মিলিয়ন ডলার গেছে নতুন গঠিত স্ট্যান্ড উইথ প্যাসিফিক ওয়ার্কার্স (STW) পিএসিতে। এই সুপার পিএসিটি পুরোপুরি সিঙ্গারের অর্থে পরিচালিত হচ্ছে এবং এখনো কোনো নির্বাচনে ব্যয় করেনি। ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ জেমিনির প্রতিষ্ঠাতা উইঙ্কলভস টুইনস ক্যামেরন ও টাইলার মিলিয়ে ৪২.৭ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। তাদের অর্থের বড় অংশ গেছে ক্রিপ্টো-পন্থী সুপার পিএসি ডিজিটাল ফ্রিডম ফান্ড, ট্রাম্পের MAGA ইনকর্পোরেটেড এবং রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনে। হেজ ফান্ড প্রধান কেন গ্রিফিন, যিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচক, তিনি এবার রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনে ৩২.২ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন।

ওপেনএআই-এর প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান ও তার স্ত্রী অ্যানাও শীর্ষ ২০ দাতার মধ্যে রয়েছেন, যারা মিলে ট্রাম্পের MAGA ইনকর্পোরেটেড এবং একটি এআই-পন্থী সুপার পিএসিতে ৫০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। কোটিপতি চার্লস কচের কোম্পানি কচ ইনকর্পোরেটেডও ৩৫ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে, তবে কচ নিজে ব্যক্তিগতভাবে মাত্র ১৭ হাজার ডলার দিয়েছেন। ট্রাম্পের MAGA ইনকর্পোরেটেডে এবারের চক্রে সবচেয়ে বড় দান এসেছে তেল ব্যবসায়ী কেলসি ওয়ারেনের কাছ থেকে, যিনি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২৫ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। বন্ধকী ঋণদাতা ম্যাট ইশিবা ও তার কোম্পানি, ব্ল্যাকস্টোনের প্রতিষ্ঠাতা স্টিফেন শোয়ার্জম্যান এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রশাসক কেলি লোফলার ও তার স্বামী জেফ স্প্রেচারও সাত অঙ্কের চেক দিয়েছেন। এস্টি লডারের উত্তরাধিকারী রন লডার, যিনি ট্রাম্পকে গ্রিনল্যান্ড কেনার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়, তিনি ২০২৫ সালের মার্চে MAGA ইনকর্পোরেটেডে ৫ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। কংগ্রেসনাল প্রার্থীদের সমর্থনে গঠিত সুপার পিএসিগুলোতেও কোটিপতিদের দান চলছে। সিনেট লিডারশিপ ফান্ডে শোয়ার্জম্যান, স্টিভ ওয়েন, জুড ও ক্রিস্টোফার রেয়েস এবং ওয়ালমার্টের উত্তরাধিকারী রব ও জিম ওয়ালটনসহ অনেকেই বড় অংকের দান করেছেন। ডেমোক্র্যাটিক দিকে সিনেট মেজরিটি পিএসিতে দান করেছেন সমাজসেবী আমোস হফস্টেটার জুনিয়র, হেজ ফান্ড ম্যানেজার স্টিফেন ম্যান্ডেল ও রিয়েল এস্টেট ব্রোকার জর্জ মার্কাস। হাউস মেজরিটি পিএসিতেও তারা সমর্থন দিয়েছেন। এছাড়া বিলিয়নেয়ার স্টিভ বালমারের স্ত্রী কনি বালমার, নেটফ্লিক্সের সহ-প্রতিষ্ঠাতা রিড হেস্টিংস ও ইলিনয়ের গভর্নর জে.বি. প্রিটজকারও দান করেছেন। প্রাক্তন নিউইয়র্ক সিটি মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ, এবিসি সাপ্লাইয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডায়ান হেনড্রিকস এবং আমেরিট্রেডের প্রতিষ্ঠাতা জে. জো রিকেটসের মতো ব্যক্তিরা ১৩ থেকে ২৬ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে দান করেছেন।

নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দান আরও বাড়তে পারে। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ফেডারেল রিপোর্ট জমা পড়লে পুরো চিত্র স্পষ্ট হবে। এই পরিসংখ্যানে কেবল ফেডারেল নির্বাচনী ব্যয় অন্তর্ভুক্ত; রাজ্য পর্যায়ের দান এর বাইরে। রাজ্য পর্যায়েও কোটিপতিরা সক্রিয়, যেমন আলাস্কার র‌্যাংকড-চয়েস ভোটিং সংক্রান্ত ব্যালট ব্যবস্থায় মাস্ক, ইয়াস, উইহলিন, টিমোথি মেলন ও জেফারি হিলডেব্র্যান্ডের মতো ব্যক্তিরা মনোযোগ দিয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার ধনীদের উপর এককালীন সম্পদ করের বিরুদ্ধেও বড় অংকের অর্থ খরচ হচ্ছে, যেখানে সের্গেই ব্রিন, এরিক শ্মিট, পিটার থিয়েল ও প্যাট্রিক কলিসনের মতো ব্যক্তিরা বিরোধিতা করছেন। গভর্নর নির্বাচনেও দান চলছে—ব্লুমবার্গ পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জোশ শাপিরোকে এবং গ্রিফিন ফ্লোরিডার প্রার্থী বায়রন ডোনাল্ডসকে সমর্থন করছেন। অন্যদিকে প্রিটজকার নিজের পুনর্নির্বাচন অভিযানে অর্থ ঢালছেন।

ট্রাম্পের MAGA ইনকর্পোরেটেড সুপার পিএসি মূলত ধনী দাতাদের কাছ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গড়েছে। ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর ৯৬ শতাংশ অর্থ এসেছে ১ মিলিয়ন ডলার বা তার বেশি দান থেকে। তবে এই অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে তা এখনো অস্পষ্ট। পিএসিটি এখন পর্যন্ত খুব কম অর্থ ব্যয় করেছে, যদিও এটি ডার্লিন গ্রাহামকে তার প্রাইমারি রেসে সমর্থন করেছিল। পলিটিকো জানিয়েছে, রিপাবলিকান প্রার্থীরা অর্থ বিতরণ না করায় হতাশ হয়ে পড়েছেন। ট্রাম্প গত সপ্তাহে বলেছেন, তিনি এই অর্থের “অনেকটাই” ভালো প্রার্থীদের জন্য ব্যয় করবেন। দ্য অ্যাটলান্টিক জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট তার নিজের রেকর্ড তুলে ধরে বিজ্ঞাপন “ব্লিটজ” চালাতে চান, যা মিডটার্ম নির্বাচনকে তার জয়ের সঙ্গে যুক্ত করবে।