বাংলাদেশের উপকূলীয় সৈকত এবং বিভিন্ন নদীর তীরে সম্প্রতি একের পর এক মৃত তিমি, ডলফিন ও শুশুকের দেহ ভেসে আসার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর বরগুনার আন্ধারমানিক নদীর তীরে ৩০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি তিমির মৃতদেহ এবং গত রোববার বিষখালী নদীতে একটি মৃত শুশুক পাওয়া গেছে। উদ্ধারকৃত মৃত প্রাণীদের অনেকের শরীরে জখমের চিহ্ন পাওয়া গেলেও কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তাদের মুখে বা শরীরে মাছ ধরার জাল শক্তভাবে জড়িয়ে ছিল।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী জানান, সম্প্রতি পাওয়া তিমিটি ছিল বেলিন প্রজাতির, যারা মূলত প্ল্যাঙ্কটন ও ক্রিল খেয়ে জীবনধারণ করে। দক্ষিণ উপকূলে তিমির এই মৃত্যু সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং সঠিক কারণ নির্ণয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ আট বছরে শুধুমাত্র কুয়াকাটা সৈকতেই ১৩৫টি মৃত ডলফিন পাওয়া গেছে। এছাড়া চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সেখানে আরও ১৬টি ডলফিন এবং প্রায় ৬০ ফুট দীর্ঘ চারটি তিমির মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, কক্সবাজার উপকূলেও গত দুই বছরে একটি তিমি এবং ১৪টির বেশি ডলফিনের মৃত্যু হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ডলফিন গবেষক মোহাম্মদ আবদুল আজিজ সতর্ক করে বলেন, বিশ্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ ইরাবতী ডলফিনের আবাসস্থল বাংলাদেশ। সুন্দরবনে ৪৫১টি এবং উপকূলীয় এলাকায় ৫ হাজার ৩৮০টি ইরাবতী ডলফিন রয়েছে। তবে বিষখালী, পায়রা ও বলেশ্বরের মোহনায় অবৈধ ছোট ফাঁসের জালের ব্যাপক ব্যবহার এই প্রাণীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। গাঙ্গেয় শুশুক, যা নদীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের সূচক হিসেবে বিবেচিত, তাদের অস্তিত্ব এখন সংকটের মুখে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) একে বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২০২৪ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের মাত্র ১৪টি নদ-নদীতে এখনো গাঙ্গেয় শুশুকের উপস্থিতি রয়েছে, যা একটি বড় সতর্কবার্তা।
বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০২৬ (সংশোধিত) অনুযায়ী, তিমি ও ডলফিন হত্যা এখন দণ্ডনীয় অপরাধ। এই অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, তিন লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা রথীন্দ্র কুমার বিশ্বাস জানান, আইনের দুর্বলতা দূর করে নতুন সংশোধনী আনা হয়েছে এবং অপরাধ দমনে পুলিশ, বিজিবি, কাস্টমস ও কোস্টগার্ডকে যুক্ত করা হয়েছে। যদিও জনবলের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবে তারা সাধ্যমতো কাজ করছেন।
বন অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, নোনা ও মিঠাপানির অনুকূল ভারসাম্যের কারণে বাংলাদেশ ইরাবতী ডলফিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে সুন্দরবনে পাঁচটি এবং দেশজুড়ে মোট নয়টি ডলফিন অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় এখনই সরকারের আরও কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।




