হেমন্তের হালকা শীতের আমেজ আর ভোরের আবছা আলোয় মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ইসলামপুর এলাকায় এক চমৎকার দৃশ্য ফুটে ওঠে। মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়কের পাশে বেশ কিছু বাড়ির বাগান, গাছপালা ও বাঁশঝাড়ে বাসা বেঁধেছে একঝাঁক শামুকখোল পাখি। প্রতিদিন ভোরেই শুরু হয় তাদের কলরব; কোনোটি ডানা ঝাপটায়, আবার কোনোটি এক গাছ থেকে অন্য গাছে উড়ে বেড়ায়। স্থানীয় বাড়ির ছোট ছোট বাগানগুলো যেন এই পাখিদের জন্য এক নিরাপদ অরণ্যে পরিণত হয়েছে।
গত শনিবার ভোরে স্থানীয় এলাকায় দেখা যায়, একদিকে যখন সড়ক দিয়ে বাস, ট্রাক ও সিএনজি অটোরিকশার ব্যস্ততা চলছে, অন্যদিকে পুব আকাশে সিঁদুর রঙের আলোর সাথে তাল মিলিয়ে গাছে গাছে মুখর হয়ে উঠেছে শামুকখোলদের ডাক। আলো বাড়ার সাথে সাথে তাদের ব্যস্ততাও বাড়ে এবং একসময় তারা দল বেঁধে মাঠ ও হাওরের দিকে খাবারের সন্ধানে উড়ে যায়। সারাদিন খাবার খোঁজার পর বিকেলে তারা পুনরায় তাদের এই পরিচিত আস্তানায় ফিরে আসে। স্থানীয় বাসিন্দা রোম্মান মিয়া জানান, গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে তিনি এই এলাকায় পাখিদের এমন নিয়মিত আসা-যাওয়া লক্ষ্য করছেন। বিকেলে যখন তারা দলবেঁধে বাড়ির ওপর চক্কর দিয়ে গাছে বসে, তখন দৃশ্যটি অত্যন্ত সুন্দর দেখায়।
এলাকার কৃষক মোশাররফ হোসেন জানান, এই অঞ্চলে কেউ পাখি শিকার করে না বলে পাখিরা এখানে নিরাপদ বোধ করে। শুধুমাত্র ইসলামপুর নয়, বরং পার্শ্ববর্তী উত্তরমুলাইম ও মল্লিকসরাই গ্রামের বাড়িগুলোতেও শামুকখোলের এই আস্তানা গড়ে উঠেছে।
প্রাণিবিদ্যার হিসেবে শামুকখোল হলো বড় আকারের সারসজাতীয় এক জলচর পাখি, যাদের দেখতে অনেকটা বকের মতো। জলাভূমি, ধানখেত ও হাওর-বাঁওড় এদের প্রধান বিচরণক্ষেত্র। এদের ঠোঁটের গঠন বিশেষ ধরনের হয়, যা দিয়ে এরা সহজেই শামুকের শক্ত খোলস ভেঙে ভেতরের নরম অংশ খেতে পারে, আর এই কারণেই অনেকে এদের ‘শামুকভাঙরি’ বলে ডাকেন। সাধারণত এদের গায়ের রং ধূসর-সাদা এবং ডানা ও লেজ কালো হয়, তবে প্রজননকালে তারা সম্পূর্ণ সাদা হয়ে যায়। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এদের প্রজননকাল, যখন তারা গাছে বাসা বেঁধে সাধারণত দুই থেকে পাঁচটি সাদা ডিম পাড়ে। প্রতিটি ঝাঁকে গড়ে ৪০ থেকে ৬০টি পাখি থাকে।
শামুকখোলের দুটি প্রজাতি থাকলেও বাংলাদেশে এশীয় শামুকখোল দেখা যায়। শামুক ও ঝিনুকের পাশাপাশি এরা ছোট ব্যাঙ, কাঁকড়া এবং জলজ পোকামাকড় খেয়ে জীবনধারণ করে। আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন-এর তালিকায় এই পাখিটি ‘কম সংকটাপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত এবং বাংলাদেশে এটি আইনগতভাবে সংরক্ষিত। দিনের আলো যত বৃদ্ধি পায়, পাখিরা ধীরে ধীরে পাতার আড়ালে বা নিচে নেমে যায় এবং প্রকৃতিতে এক শান্ত পরিবেশ নেমে আসে।




