মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের দুই ভিন্ন রূপ দেখে ফেলল বাংলাদেশ। উত্তরের কুমিরের রাজধানী হিসেবে পরিচিত ডারউইনে ১৬ আগস্ট চতুর্থ দিনে ঐতিহাসিক জয় পাওয়ার পর ২৩ আগস্ট কুইন্সল্যান্ডের ছোট শহর ম্যাকাইয়ে দুই দিনের মধ্যে টেস্ট হারের তিক্ত বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় নাজমুল হোসেন শান্তর দলকে। চিনিশিল্পের জন্য 'সুগার সিটি' এবং মাছ ধরার জন্য 'ফিশিং ক্যাপিটাল' নামে পরিচিত ম্যাকাইয়ের উইকেটে বাংলাদেশের ব্যাটারদের অবস্থা ছিল শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া পাইওনিয়ার রিভার থেকে ছিপের টানে তোলা ছটফট করা মাছের মতোই অসহায়।

ঘরের মাঠে ১৩৯ বছর ধরে ধবলধোলাই না জানা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইনে জেতার পর বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ছিল ইতিহাস গড়ার। মিচেল স্টার্কদের মাটিতে প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়ের স্বপ্ন দেখেছিল দলটি, কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণের ধারেকাছেও যেতে পারেনি তারা। দুই দিনের মধ্যে হেরে যাওয়ায় কোনো অজুহাত বা ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ নেই বলেই মন্তব্য করেছেন অধিনায়ক। ম্যাচ শেষে ম্যাকাইয়ের গতিময় ও বাউন্সি উইকেটকে কারণ হিসেবে দেখালেও নিজেদের ব্যাটিং ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন তিনি। একই আক্ষেপ প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশারের কণ্ঠেও ছিল। তিনি মনে করেন, সিরিজ জেতার ভালো সুযোগ তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তারা আরও ভালো ক্রিকেট খেলতে পারত।

তবে শুধু বাংলাদেশই নয়, এবার অস্ট্রেলিয়ান সংবাদমাধ্যমও প্রশ্ন তুলেছে এমন উইকেট তৈরির বিষয়ে যেখানে ১০ মাসের মধ্যে তিনটি টেস্ট দুই দিনেই শেষ হয়ে গেল। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া এমন উইকেট বানিয়ে টেস্ট ক্রিকেটেরই ক্ষতি করছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। মাত্র দুই দিনে ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়ায় শুধু বাংলাদেশেরই বাজে হারতে হয়নি; ম্যাকাই শহরের মানুষের জীবনযাত্রাতেও এর প্রভাব পড়েছে। জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্টের শুরু পর্যন্ত এখানে 'ম্যাকাই ফেস্টিভাল অব আর্টস' অনুষ্ঠিত হয়, যা স্থানীয় শিল্প-সংস্কৃতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে আসে। বাংলাদেশ দল আসার আগেই এবারের ৩৯তম আসর শেষ হয়েছে। এর বাইরে সাধারণত শহরটিতে তেমন বড় আয়োজন হয় না; পর্যটকেরা আসেন সমুদ্র, গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ বা বিচের সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

প্রথমবারের মতো টেস্ট ম্যাচ আয়োজন করায় ম্যাকাইবাসী ছিলেন উচ্ছ্বসিত। তাঁরা ভেবেছিলেন, ঘরের মাঠে টেস্ট ক্রিকেট দেখার পাশাপাশি শহরের গুরুত্ব বাড়বে এবং ক্রিকেট পর্যটকদের আগমনে হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে জমজমাট পরিবেশ তৈরি হবে। সে আশা কিছুটা পূরণও হয়েছিল; ১০০ ডলারের হোটেল রুমের ভাড়া বেড়ে ৪০০-৫০০ ডলারে পৌঁছেছিল এবং শেষ দিকে নগদ ডলার হাতে নিয়েও হোটেল পাওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু পাঁচ দিনের খেলা দুই দিনেই শেষ হয়ে যাওয়ায় হোটেল-মোটেলের বুকিং ক্যানসেল এবং মোটা অঙ্কের ডলার গুনে ফ্লাইট বদলানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ সফল হলেও অনেকেই ম্যাকাইয়ে অনাহূত অবকাশ কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। বাংলাদেশ দলের কয়েকজন ক্রিকেটার পরিবার নিয়ে অন্য শহরে বেড়াতে গেলেও টিম হোটেলে থাকা খেলোয়াড়-কর্মকর্তার সংখ্যাও কম নয়।

তবে আশ্চর্যের বিষয়, ম্যাকাইয়ের কেউই বাংলাদেশ দলকে বলছেন না যে দুই দিনে টেস্ট হেরে তাঁদের উৎসব মাটি করে দিয়েছে। বরং ডারউইনের অবিস্মরণীয় জয়ের কথা স্মরণ করে উল্টো সান্ত্বনা দিচ্ছেন তাঁরা। অনেকে মনে করছেন, বাংলাদেশের জন্য কঠিন উইকেট বানিয়ে কাজটা ঠিক করেনি অস্ট্রেলিয়া; ঘরের মাঠের সুবিধা এভাবে নেওয়া 'নির্লজ্জতা'। দলের সঙ্গে থাকার সুবাদে ডারউইন থেকেই অস্ট্রেলিয়ানদের এমন প্রশংসার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হচ্ছেন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার। তিনি বলেন, শুধু সাবেক ক্রিকেটাররাই নন, সাধারণ মানুষও যেভাবে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের প্রশংসা ও সম্মান জানাচ্ছে, তা সত্যিই অসাধারণ। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়া হেরেছে বলে তাঁদের মন খারাপ ছিল, কিন্তু তারপরও তাঁরা বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন। দুই দিনে হারের বিপর্যয়ের পরও এখানকার মানুষ ডারউইন-জয়ের জন্যই বাহবা দিয়ে যাচ্ছে, যা অনুভূতির আবরণটাকে স্তুতিবাক্যে মুড়িয়ে রেখেছে। টেস্ট সিরিজ ড্র করার স্মৃতি তাই ভালোবাসার ফ্রেমেই বাঁধাই হয়ে থাকবে বাংলাদেশের জন্য।