মাঠের ফলাফল যাই হোক, বাণিজ্যিক দৌড়ে রিয়াল মাদ্রিদ যেন অন্য এক উচ্চতায় অবস্থান করছে। স্প্যানিশ জায়ান্টদের ব্র্যান্ড মূল্য বিগত এক বছরে এক-চতুর্থাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২৪০ কোটি ইউরো (প্রায় ২৭৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার) ছুঁয়েছে। লা লিগায় রানার্সআপ হওয়া কিংবা ঘরোয়া আসরে টানা দুই মৌসুম শিরোপা না জিতলেও এই আর্থিক সাফল্যের ওপর তার কোনো প্রভাব পড়েনি। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড মূল্যায়নকারী সংস্থা 'ব্র্যান্ড ফাইন্যান্স' তাদের ২০২৬ সালের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, পরপর তৃতীয়বারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ফুটবল ক্লাব ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেদের অবস্থান অটুট রেখেছে লস ব্লাঙ্কোসরা। সংস্থাটির পরিসংখ্যান মতে, বিশ্বের সেরা ৫০টি ক্লাবের সম্মিলিত ব্র্যান্ড মূল্য এখন রেকর্ড ২ হাজার ৩৯০ কোটি ইউরোতে পৌঁছেছে, আর এন্টারপ্রাইজ ভ্যালু বা সামগ্রিক আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৯৭০ কোটি ইউরোতে। ক্রীড়া ব্র্যান্ডের ইতিহাসে এক বছরে মোট প্রবৃদ্ধির হার এটিই সর্বোচ্চ। ব্র্যান্ড মূল্য মূলত ক্লাবের নামের বাজারমূল্য নির্দেশ করে — ভবিষ্যতে শুধু নামটি ব্যবহার করে কতটা আয় সম্ভব তার হিসাব। অন্যদিকে, এন্টারপ্রাইজ ভ্যালু পুরো ক্লাবটি কিনতে গেলে মোটামুটি কত খরচ হতে পারে তার আভাস দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফুটবলের মোট ব্র্যান্ড মূল্যের ৬০ শতাংশের বেশি এখন শীর্ষ ১০ ক্লাবের দখলে, ফলে ধনী প্রতিষ্ঠানগুলো আরও ধনী হচ্ছে এবং বাকিদের ফাঁক ক্রমেই বাড়ছে।
তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বর্তমান লা লিগা চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনা। কাতালান ক্লাবটির ব্র্যান্ড মূল্য ২২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার। তবে ২০২৬ সালের র্যাঙ্কিংয়ে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে আর্সেনাল। ২২ বছর পর প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জয় এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ওঠার রোমাঞ্চকর পারফরম্যান্সের সুবাদে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সেরা তিনে জায়গা করে নিয়েছে লন্ডনের ক্লাবটি, তাদের ব্র্যান্ড মূল্য এখন ১৭৭ কোটি ২০ লাখ ডলার। রিয়াল মাদ্রিদের ব্র্যান্ড মূল্য বৃদ্ধির পেছনে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সান্তিয়াগো বার্নাব্যু স্টেডিয়ামের সংস্কার কাজ। ২০২৫-২৬ মৌসুম ছিল সংস্কার শেষে পূর্ণ ক্ষমতায় স্টেডিয়াম ব্যবহারের প্রথম বছর, যেখানে ম্যাচ-ডে টিকিট, আতিথেয়তা পরিষেবা, জাদুঘর দর্শন এবং পর্যটন থেকে রেকর্ড ১২০ কোটি ইউরোর রাজস্ব আহরণ করেছে ক্লাবটি। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য ভক্ত, লাভজনক স্পনসরশিপ চুক্তি এবং কিলিয়ান এমবাপ্পে, জুড বেলিংহাম ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো তারকাদের উপস্থিতি রিয়ালকে বাণিজ্যিক ফুটবলের শীর্ষে টিকিয়ে রেখেছে।
দ্বিতীয় স্থানে থাকা বার্সেলোনা তাদের ব্র্যান্ড মান ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ২০০ কোটি ইউরোতে নিয়ে গেছে। কোচ হান্সি ফ্লিকের অধীনে টানা দ্বিতীয়বার লা লিগা ও স্প্যানিশ সুপার কাপ জয় এই অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে ক্যাম্প ন্যুতে খেলতে না পারার কারণে বছরে প্রায় ১০ কোটি ইউরোর ঘাটতি তৈরি হচ্ছিল, যা স্টেডিয়ামে ফেরার পর কেটে গেছে। রেকর্ড স্পনসরশিপ ও অনলাইন বিক্রির ওপর ভর করে বার্সেলোনাও এখন ১ বিলিয়ন ইউরো রাজস্বের কাছাকাছি, ফলে রিয়ালের সাথে তাদের ব্যবধান আগের তুলনায় অনেকটাই কমে এসেছে।
আর্সেনালের ২০২৬ সালটি সবচেয়ে সফল গল্পগুলোর একটি। পাঁচ ধাপ এগিয়ে তারা তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে, যেখানে তাদের ব্র্যান্ড মূল্য ২৮ শতাংশ বেড়ে ১৫০ কোটি ইউরো হয়েছে। ২২ বছর পর প্রিমিয়ার লিগ জয় এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ওঠা ক্লাবটির বাণিজ্যিক চিত্র সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। নতুন স্টেডিয়াম ও জার্সির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ফলে তাদের রাজস্ব প্রায় ৭৯ কোটি পাউন্ডে পৌঁছেছে। জার্মান চ্যাম্পিয়ন বায়ার্ন মিউনিখ দুই ধাপ উঠে চতুর্থ স্থান দখল করেছে, তাদের মূল্য ১৭৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার। গত মৌসুমে বুন্দেসলিগা, জার্মান কাপ ও জার্মান সুপার কাপ জিতে ঘরোয়া ট্রেবল সম্পন্ন করেছে তারা। পঞ্চম স্থানে থাকা পিএসজির ব্র্যান্ড মূল্য ১৭৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার, তবে ফরাসি লিগের সীমিত বৈশ্বিক আকর্ষণ তাদের আরও এগিয়ে যেতে বাধা দিচ্ছে।
ব্র্যান্ড মূল্য বাড়লেও র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি (১৭০ কোটি ৯০ লাখ ডলার), লিভারপুল (১৬৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার) ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড (১৬৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার)। ইউরোপে কম সাফল্য এবং পেপ গার্দিওলার বিদায় সিটির আয় বৃদ্ধির গতি কমিয়েছে। লিভারপুলের মৌসুমটি প্রত্যাশা অনুযায়ী না গেলেও তাদের বৈশ্বিক ব্র্যান্ড শক্তি অটুট রয়েছে। শীর্ষ দশের বাকি দুই স্থানে রয়েছে চেলসি (১১০ কোটি ১০ লাখ ডলার) এবং বরুসিয়া ডর্টমুন্ড (৭৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার)। দীর্ঘ এক দশক পর সেরা দশে ফিরে আসা ডর্টমুন্ড সম্প্রচার স্বত্ব, টিকিট ও মার্চেন্ডাইজিং থেকে পাওয়া আয়ে আবারও অভিজাতদের কাতারে স্থান পেয়েছে।




