শেকড়ের প্রতি গভীর অনুরাগ নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন মাস্টারশেফ ইউকের সেমিফাইনালিস্ট সাবিনা খান। ব্রিটিশ-বাংলাদেশি এই রন্ধনশিল্পীর সঙ্গে সম্প্রতি হাল ফ্যাশনের একান্ত আলাপচারিতায় উঠে এসেছে তাঁর রান্নার দর্শন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশি খাবারের পরিচিতি এবং জীবনের নতুন অধ্যায়ের নানা দিক। সাবিনা মনে করেন, রান্না কেবল খাবার তৈরি নয়; এটি বাংলাদেশের গল্প বলার একটি শক্তিশালী ভাষা। তাঁর ইচ্ছা, একদিন মানুষ যেন বলে, “চল আজ বাংলাদেশি খাবার খেতে যাই” — ঠিক যেমনভাবে ভারতীয় কারির কথা বলা হয়।

মানিকগঞ্জের মেয়ে সাবিনার ছোটবেলা থেকেই রান্নার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক। মা ও দাদির হাতের রান্না দেখে বড় হয়েছেন তিনি। ছোটবেলায় বাইরে খাওয়ার সুযোগ কম থাকায় তাঁদের বাড়িটিই ছিল পরিবারের সবচেয়ে বড় রেস্তোরাঁ। মা শুধু বাঙালি খাবারই নয়, পিৎজা, বার্গার, কাবাব, বিরিয়ানি, ডেনিশ পেস্ট্রি, চকোলেট কেকসহ নানা আন্তর্জাতিক খাবার রান্না করতেন। তখন ইন্টারনেট বা ইউটিউব ছিল না, তবু মা কোথাও থেকে রেসিপি খুঁজে বের করে রান্না করতেন। সাবিনার মতে, রান্না শুধু উপকরণ মেশানো নয়; প্রতিটি খাবারের মধ্যে ভালোবাসা, যত্ন ও স্মৃতি লুকিয়ে থাকে। স্কুল থেকে ফিরে পরিবারের সঙ্গে একত্রে বসে খাওয়ার সেই স্মৃতিগুলোই তাঁর খাবারের প্রতি ভালোবাসার ভিত্তি গড়ে তুলেছে।

প্রায় ৫০ বছর বয়সে এসে রান্নাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার অনুভূতি নিয়ে সাবিনা বলেন, তিনি সবসময়ই স্বপ্নের কাজ করেছেন, শুধু তা বুঝতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। দীর্ঘদিন কনসালট্যান্ট, গবেষক ও সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। পাশাপাশি প্রায় ২০ বছর ধরে পরিবার ও বন্ধুদের জন্য রান্না করেছেন। নতুন কিছু তৈরি করা, মানুষকে খাওয়ানো ও একসঙ্গে বসানোর আনন্দই তাঁর ভেতরের প্যাশনকে স্পষ্ট করেছে। তাঁর মতে, ১৬, ২০ বা ৩০ বছর বয়সে নেওয়া সিদ্ধান্তই সারাজীবনের জন্য চূড়ান্ত নয়; জীবনের অনেক পরে গিয়েও ক্যারিয়ার বদলানো সম্ভব এবং সেটি মানুষকে আরও বেশি সুখী করতে পারে।

মাস্টারশেফ ইউকে ছিল তাঁর জীবনের মোড় ঘোরানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ। প্রথমবার অনুষ্ঠানে গিয়ে নিজের ওপর খুব একটা বিশ্বাস ছিল না; ভেবেছিলেন একটি অ্যাপ্রন পেয়ে হয়তো প্রথম রাউন্ডেই বের হয়ে যাবেন। কিন্তু ধাপে ধাপে এগোতে গিয়ে বুঝতে পারেন, জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা — গবেষণার দক্ষতা, যোগাযোগের ক্ষমতা, চাপের মধ্যে কাজ করার সক্ষমতা ও সময় ব্যবস্থাপনা — সবকিছুই রান্নাঘরে কাজে লেগেছে। শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছান তিনি। ট্রফি হাতে না ফিরলেও বহু মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। শেষ পর্যায়ে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেও বিশ্বাস করেন, কখনো কখনো সরে আসাও সঠিক সময়ের অংশ। মাস্টারশেফ তাঁর জীবনকে এক বছরের মধ্যে আমূল বদলে দিয়েছে — কাজ, চিন্তাভাবনা ও আত্মবিশ্বাসে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন।

পাঠকদের জন্য তিনি বিশেষভাবে তিনটি খাবার প্রস্তুত করেছেন — বাঙালি প্রন টোস্ট উইথ সালাদ, বাংলাদেশি রঙিন প্রন এবং গুয়াকামোলে উইথ পমগ্র্যানেট। এই খাবারগুলোর মাধ্যমে তাঁর রান্নার দর্শন — বাংলাদেশি স্বাদ ও আন্তর্জাতিক উপস্থাপনার মিশ্রণ — স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মুড়ি-পেঁয়াজু বা ঝালমুড়ি নিয়ে মাস্টারশেফের মঞ্চে যে আলোচনা হয়েছিল, সেটি নিয়ে সাবিনা স্পষ্ট করেন, তিনি কখনো কোনো খাবারকে শুধু পরিচিত রূপে উপস্থাপন করতে চাননি। তাঁর পরিবেশিত খাবারটিতে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাব ছিল — সেখানে ফালাফেল, কনফি রসুন ও পাঁচফোড়নের মিশ্রণে তৈরি একটি সস যুক্ত ছিল। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশি খাবারের স্বাদ, গল্প ও পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখে সেটিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা। তাঁর মতে, শুধু পরিচিত খাবারটি সামনে রাখলেই হবে না; আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছাতে হলে ভাবতে হবে কীভাবে সংযোগ তৈরি করা যায়।

বাংলাদেশি খাবারকে একটি শব্দে বর্ণনা করতে বললে সাবিনা বলেন, “জটিল” — তবে ভালো অর্থে। ভর্তা থেকে পোলাও, মাছ থেকে মাংস — একেকটি খাবারের স্বাদ, রান্নার পদ্ধতি, মসলা ও ইতিহাস আলাদা। মুড়িঘণ্টের মতো খাবারকে বিদেশির কাছে বোঝানোর চ্যালেঞ্জই তাঁকে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী করে। তিনি এমন একটি রেস্তোরাঁর স্বপ্ন দেখেন, যেখানে মানুষ শুধু “বাংলাদেশি খাবার” খাবে না, বরং একটি অভিজ্ঞতা নেবে। একই ভর্তা বা মুড়িঘণ্ট সবার জন্য পরিবেশন করলে হবে না; ইতালীয় পাস্তার ধারণা নিয়ে মুড়িঘণ্টকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে চান তিনি, যাতে খেলে বাংলাদেশকে চেনা যায় কিন্তু উপস্থাপনাটি নতুন হয়।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সাবিনা জানান, এখনই রেস্তোরাঁ খোলার ইচ্ছা নেই। কারণ সেটি শুরু ও দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন। বর্তমানে তিনি লন্ডন ও জেনেভায় সাপার ক্লাব করছেন। যত বেশি মানুষকে তাঁর হাতের রান্না খাওয়াতে পারবেন, তত বেশি মানুষ বাংলাদেশের খাবারকে নিজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে চিনবে। ক্যাটারিং, লেখালেখি ও খাদ্য ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে চান তিনি। প্রায় ১০ বছর একটি জার্নালের সম্পাদক ছিলেন; এখন দ্য ডেইলি স্টার-এর জন্যও লিখছেন। একটি বিরিয়ানি ও বার্মিজ খাবারের ইতিহাস ও বিবর্তন নিয়ে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে। রান্না, ক্যাটারিং, সাপার ক্লাব ও লেখালেখি — কোনো একটি কাজে নিজেকে আটকে রাখতে চান না তিনি।

বাংলাদেশি নারীদের নিয়ে কাজ করাও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ স্বপ্ন। দেশে অনেক নারী অসাধারণ রান্না করেন, কিন্তু ব্যবসা শুরু করার সাহস বা পথ জানা নেই। সাবিনা তাঁদের প্রশিক্ষণ দিতে চান — শুধু রান্না নয়, কীভাবে ক্যাটারিং শুরু করতে হয়, নিজের খাবারকে মানুষের সামনে তুলতে হয়, ব্যবসায় পরিণত করতে হয়, সেসব নিয়ে। তাঁর বিশ্বাস, একজন নারী যদি নিজের দক্ষতা দিয়ে আয় করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন, তাহলে তাঁর পরিবারের জীবনও বদলে যায়।

ব্যায়াম ও ফিটনেস তাঁর রান্নার মতোই জীবনের অপরিহার্য অংশ। ওজন কমানো বা পাতলা হওয়ার জন্য নয়, মানসিক সুস্থতার জন্য তিনি দৌড়ান ও ব্যায়াম করেন। পার্কে বা ট্রেডমিলে দৌড়ানোর সময় চিন্তা করেন, শান্ত হন, নতুন আইডিয়া পান। অনেক সময় রান্নার নতুন ধারণাও মাথায় আসে। তাঁর মতে, শরীর ও মন ভালো রাখার জন্য ব্যায়াম জরুরি; বয়স বাড়ার সঙ্গে শক্তিশালী শরীর শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অংশও। ৫০ বছর বয়সে তিনি বাজারের বড় ব্যাগ অনায়াসে তুলতে পারেন, যা তাঁর সন্তানদের পক্ষেও কঠিন। হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা ওজন নিয়ে ব্যায়াম — যেকোনোভাবে শরীর সচল রাখা প্রয়োজন।

জীবনের এই পর্যায়ে এসে তাঁর সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হলো, নিজের প্যাশনকে কখনো ছোট করে দেখা উচিত নয়। নতুন কিছু চেষ্টা করা, সাঁতার শেখা, গান গাওয়া বা রান্না করা — সবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, কখনো হাল ছাড়া উচিত নয়; সারাজীবন একই কাজ করতে হবে — এমন কোনো নিয়ম নেই। মাস্টারশেফে যেতে ইচ্ছুকদের পরামর্শ, নিজের ওপর সন্দেহ না করে আবেদন করুন। তিনি নিজেও ভেবেছিলেন প্রথম রাউন্ডেই বের হয়ে যাবেন, কিন্তু ধাপে ধাপে নিজের সেরাটা দিয়েছেন। শুধু সাহস করে দরজায় কড়া নাড়লেই কখনো কখনো অবিশ্বাস্য দরজা খুলে যায়।