যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর থেকে শেয়ার বাজারে এমন মাত্রায় লেনদেন করেছেন, যা মার্কিন কংগ্রেসের সকল সদস্যের সম্মিলিত লেনদেনের চেয়েও বেশি। ব্লুমবার্গের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ১৭ মাসে তিনি প্রায় ২৮,৭০০টি সিকিউরিটিজ ট্রেড করেছেন, যার গড় হিসাব প্রতি বাজার কার্যদিবসে প্রায় ৮০টি লেনদেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তার আর্থিক বিবরণীতে মূলত রিয়েল এস্টেট এবং ব্যক্তিগত ব্যবসার প্রাধান্য ছিল। তবে ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত দাখিল করা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তার বর্তমান বিনিয়োগের ধরন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আগস্ট ২০২৫ এর মধ্যে তিনি মিউনিসিপাল ও কর্পোরেট বন্ডে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি এবং সামগ্রিকভাবে ৩৩৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছেন। এছাড়া তার অ্যাকাউন্টে ব্যাংক প্রেফারড সিকিউরিটিজ এবং বন্ড ইটিএফ-এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত প্রথম ত্রৈমাসিকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, মাত্র ৯০ দিনে তিনি প্রায় ৩,৬০০টি লেনদেন করেছেন। অন্যদিকে, ৩০ জুন প্রকাশিত প্রায় এক হাজার পৃষ্ঠার বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালেই তিনি ২১,০০০-এর বেশি ট্রেড করেছেন, যার মূল্য ৬০০ মিলিয়ন থেকে ১.৮৬ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। তার আটটি পৃথক বিনিয়োগ অ্যাকাউন্ট থাকলেও সেগুলো কোন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলের হোয়াইট হাউসের প্রধান নৈতিকতা বিষয়ক আইনজীবী এবং বর্তমানে মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিকিউরিটিজ আইনের অধ্যাপক রিচার্ড পেইন্টার এই পরিস্থিতিকে একটি 'বিশাল সমস্যা' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, মার্কিন ইতিহাসে আগে কোনো প্রেসিডেন্ট এভাবে সরাসরি শেয়ার বাজারে লেনদেন করেননি। লিন্ডন জনসনের পর থেকে প্রায় সব প্রেসিডেন্টই 'ব্লাইন্ড ট্রাস্ট', ইনডেক্স ফান্ড অথবা ট্রেজারি বন্ড ব্যবহার করে স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলতেন। উদাহরণস্বরূপ, জিমি কার্টার তার পরিবারের পিনাট ব্যবসাকে একটি ব্লাইন্ড ট্রাস্টের অধীনে রেখেছিলেন।
ট্রাম্পের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে হোয়াইট হাউসের বয়ানে অসামঞ্জস্য দেখা গেছে। মে মাসে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইনগেল জানিয়েছিলেন, এই সম্পদগুলো প্রেসিডেন্টের সন্তানদের দ্বারা পরিচালিত একটি ট্রাস্টের অধীনে রয়েছে। যদিও এরিক ট্রাম্প দাবি করেন যে পরিবারের কোনো সদস্য ব্যক্তিগতভাবে শেয়ার কিনছেন না। পরবর্তীতে হোয়াইট হাউস জানায়, তৃতীয় পক্ষের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কম্পিউটার-ভিত্তিক মডেল পোর্টফোলিও ব্যবহার করে এটি পরিচালনা করছে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট ইনডেক্স অনুসরণ করে। তবে কোন প্রতিষ্ঠান এটি করছে, তা তারা জানাননি।
ফর্চুন-এর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ট্রাম্পের অ্যাকাউন্টে এমন কিছু লেনদেন হয়েছে যা সরকারি কার্যক্রমের সাথে সংগতিপূর্ণ মনে হতে পারে। যেমন, এপ্রিল মাসে হোয়াইট হাউসে ম্যাকডোনাল্ডস অর্ডার করার সময় তার অ্যাকাউন্টে ১.৩৮ মিলিয়ন ডলারের ডোরড্যাশ (DoorDash) শেয়ার কেনা হয়। এছাড়া চিপ-ট্যারিফ সংক্রান্ত তথ্য ফাঁসের ঠিক একদিন পর বড় অংকের হাইপারস্কেলার স্টক বিক্রি এবং ইরান যুদ্ধের শুরুতে জ্বালানি খাতের শেয়ার কেনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ডিমের সংকটের সময় দেশের বৃহত্তম ডিম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ক্যাল-মেইন (Cal-Maine) এর শেয়ার কিনে মাত্র দুই মাস পর দ্বিগুণ বা পাঁচগুণ মুনাফায় তা বিক্রি করা হয়েছে।
আইনজীবীদের মতে, প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট ছাড়া নির্বাহী বিভাগের অন্য সকল কর্মকর্তাকে এমন নিয়ম মানতে হয় যা তাদের নিজস্ব বিনিয়োগের সাথে সংঘাতপূর্ণ সরকারি কাজে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ করে। পেইন্টার সতর্ক করে বলেন, যদি প্রেসিডেন্ট তেল কোম্পানির শেয়ারের মালিক হন এবং তার সিদ্ধান্তে তেলের দাম বাড়ে, তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হবেন, যার বোঝা সাধারণ মানুষকে বহন করতে হবে। যদিও ট্রাম্প কংগ্রেস সদস্যদের জন্য শেয়ার লেনদেনের নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করেছেন, তবে যখন এই নিষেধাজ্ঞা প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রেও কার্যকর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়, তখন তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।




