জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যুদ্ধাপরাধের যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মিনাবের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যখন শিশুদের ক্লাস চলছিল, ঠিক সেই সময়েই ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। প্রতিবেদনে আক্রান্ত স্কুলের নাম এবং সংশ্লিষ্ট আইনি দিকগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে এই গুরুতর অভিযোগের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিচার করবে কোন আদালত এবং তাকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা কার আছে? আন্তর্জাতিক আইনের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নের উত্তরটি যেমন স্পষ্ট, তেমনি হতাশাজনক। যুক্তরাষ্ট্র রোম সংবিধিতে স্বাক্ষর করেনি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) এখতিয়ার তারা মেনে নেয় না। এমনকি এই আদালতের বিচারকদের ওপরও যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ফলে কোনো আন্তর্জাতিক বাহিনীর পক্ষে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব নয়, যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ইচ্ছা থাকে।
প্রতিবেদনে এই বৈষম্যের কথা বলা হয়েছে যে, ছোট দেশের নেতাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে হেগে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও বড় দেশের নেতারা অনায়াসে নিউইয়র্কে ভাষণ দিতে পারেন। একপক্ষের অপরাধ যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, অন্যপক্ষের ক্ষেত্রে তা কেবল একটি 'কৌশল' বা 'লক্ষ্যভ্রষ্ট তথ্যভাণ্ডার' হিসেবে অভিহিত করা হয়।
উল্লেখ্য যে, এই প্রতিবেদনে কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলা হয়েছে। বিক্ষোভ দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ইরানের বিরুদ্ধেও আনা হয়েছে। অর্থাৎ, আক্রমণকারী এবং নিপীড়িত—উভয় পক্ষই এখানে দোষী। তবে বিচারের ক্ষেত্রে দুই পক্ষের অবস্থান সমান নয়। একদিকে যেখানে আন্তর্জাতিক আদালত ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর হয়, অন্যদিকে সেখানে মার্কিন ভেটো ক্ষমতা, শক্তিশালী পাসপোর্ট এবং এয়ার ফোর্স ওয়ানের সুরক্ষা বিদ্যমান।
পরিশেষে বলা হয়েছে, পুলিশ, জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা বাহিনী বা হেগের বিচারকদের মাধ্যমে ট্রাম্পের বিচার হওয়া প্রায় অসম্ভব। সম্ভবত ইতিহাসই হবে তার চূড়ান্ত বিচারক, তবে তা হবে অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী এবং নিঃশব্দ। যখন ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ থেমে যাবে এবং স্কুলের খালি বেঞ্চগুলো সাক্ষ্য দেবে, তখন হয়তো পরবর্তী প্রজন্মের বইয়ে এই বিচারের রায় লেখা হবে। এই পুরো পরিস্থিতি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—আইন কি আসলেই সবার জন্য সমান, নাকি তা কেবল তাদের জন্যই যাদের নিজেদের কোনো শক্তি বা কামান নেই?




