রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত ১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। জোটের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে এই বৈঠক সম্পন্ন হয়। সেখানে সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমকে ব্যর্থ হিসেবে চিহ্নিত করে মন্ত্রিপরিষদে আরও পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়। এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম জোটের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন।

তিনি বলেন, মাত্র ছয় মাসের মধ্যে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করতে হয়েছে, যা সরকারের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ঘাটতির স্পষ্ট প্রমাণ। তার মতে, অধিকাংশ মন্ত্রীই তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবেন। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি আরও জানান, আইনশৃঙ্খলার পরিবেশ মোটেও উন্নতি পায়নি, ফলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো পুনর্গঠনের প্রয়োজন রয়েছে। বিরোধী দল প্রয়োজনে সরকারকে নীতিগতভাবে সহায়তা করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ১৮০ দিনের অব্যবস্থাপনার কারণে জনগণের ভোগান্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জনআস্থা একেবারেই তলানিতে নেমে গেছে। নির্বাচনের আগে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে বিএনপির সরকার ক্ষমতায় এলে দেশে আইনশৃঙ্খলার পরিবেশ ঠিক হবে; কিন্তু তা বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অন্তর্বর্তী সরকার বা বিপ্লব-পরবর্তী অবস্থার চেয়েও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে লোডশেডিং বৃদ্ধি পেয়েছে, সার ও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে এবং গ্যাসের দাম বেড়েছে। কয়েক শত কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরাও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ব্যর্থতার কথা স্বীকার না করে উল্টো ১৮০ দিনের সাফল্য দেখানোর চেষ্টা করছে। সরকারের উচিত ছিল জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং বিরোধী দলসহ জনগণের কাছে সহযোগিতা কামনা করা।

দেশ পরিচালনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবের কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের কাছে কীভাবে দেশ চালাতে হয় সেই পরিকল্পনা নেই; সে কারণে তারা বিরোধী দলের কাছে পরিকল্পনা চাইছেন। সরকারের উচিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণে কাজ শুরু করা এবং সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি জাতীয় নীতি প্রণয়ন করা।

ভারত সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারপ্রধান ভারত সফর করবেন কিনা—সে বিষয়ে জনগণকে কোনো সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া যাচ্ছে না। গত ৫ আগস্ট ভারতের দিল্লিতে আওয়ামী লীগকে সংবাদ ব্রিফিংয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে; কিন্তু এ নিয়ে ভারত সরকারকে যথাযথ জবাবদিহির আওতায় আনতে বাংলাদেশ সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এ বছর গঙ্গা চুক্তি শেষ হবে এবং অন্যান্য নদীর পানি বণ্টন চুক্তি, সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন ইত্যাদি বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করে বাংলাদেশকে নতুন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে করতে হবে। আওয়ামী লীগের বিষয়ে সুরাহা না হওয়া, শেখ হাসিনার বিচার এবং ওসমান হাদির খুনিদের বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর জাতির জন্য কল্যাণকর হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ছিল একটি অকার্যকর নির্বাচন। জোটের অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা জনগণের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন যে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে গোপন ব্যালটে ভোটের ব্যবস্থা না থাকলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আসলে একটি প্রহসনের মতো হবে।

জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি জানান, আগামী ৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টায় রাজধানীর শাপলা চত্বরে ১১ দল জমায়েত করবে এবং সেখান থেকে লংমার্চ করে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করবে। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুরমুখী লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে। খুলনার পূর্বঘোষিত ১০ অক্টোবরের লংমার্চ ৩১ অক্টোবর এবং সিলেটমুখী ২৪ অক্টোবরের কর্মসূচি ২১ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তা ওই তারিখে হচ্ছে না। বিভাগভিত্তিক লংমার্চের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এবং এরপর ঢাকায় মহাসমাবেশের তারিখ ঠিক করা হবে বলে তিনি জানান।