রাজধানীর কাকরাইলের ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) মুক্তিযোদ্ধা হলে রোববার দুপুরে অনুষ্ঠিত হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা। জাতীয় সীরাত উদ্যাপন কমিটির আয়োজনে ‘সীরাতুন্নবী: রাসুল (সা.)–এর নীতি ও আদর্শ’ শীর্ষক এই সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। একই অনুষ্ঠানে একটি রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণীও সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় সীরাত উদ্যাপন কমিটির সদস্যসচিব আবদুল মান্নান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ক ম আবদুল কাদের। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আ ন ম রফিকুর রহমান মাদানী। আরও বক্তব্য রাখেন বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শামসুল আলম, তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা যাত্রাবাড়ী শাখার অধ্যক্ষ খলিলুর রহমান মাদানী এবং শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান প্রথমেই আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, দলটি এত অপকর্ম করেছে যে দেশের ভেতরে স্থির থাকতে পারেনি, পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। ইতিহাসের দৃষ্টান্ত টেনে তিনি মন্তব্য করেন, যারা অন্যায়ের বোঝা নিয়ে পালিয়ে যায়, ইতিহাস বলে তারা আর ফিরে আসতে পারে না। তাঁর অভিযোগ, পনেরো বছর ধরে ফ্যাসিবাদী সরকার যে রাস্তা বেছে নিয়েছিল, বর্তমান সরকারও সেই একই পথ ধরে হাঁটা শুরু করেছে।
এই পথের বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, এটি আয়নাঘর তৈরির রাস্তা, বিনা বিচারে হত্যা ঘটানোর রাস্তা এবং শাপলা চত্বরে আলেমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার রাস্তা। ফ্যাসিবাদের এই পথ থেকে সরকারকে অবশ্যই সরে আসতে হবে বলে তিনি জোর দাবি জানান। শফিকুর রহমান আরও বলেন, চব্বিশ সালে যারা জেগে উঠেছিল, তারা সবাই মারা যায়নি। তারা ঘুমিয়ে পড়েনি, বরং সজাগ দৃষ্টিতে সবকিছু প্রত্যক্ষ করছে। সামরিক প্রস্তুতির তুলনা টেনে তিনি ব্যাখ্যা করেন, মূল যুদ্ধের আগে বাহিনী তৈরি হয়, তাদের কসরত করতে হয় এবং রিহার্সাল দিতে হয়। যারা মনে করছে ২০২৪ ছিল চূড়ান্ত যুদ্ধ, তাদের উদ্দেশে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এটি ছিল কেবল চূড়ান্ত যুদ্ধের রিহার্সাল।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ধারণা করা হয়েছিল যে যুগ যুগ ধরে জমে থাকা ফ্যাসিবাদের আবর্জনা এবার পরিষ্কার হয়ে যাবে। অথচ জামায়াত আমিরের মতে, আবর্জনা পরিষ্কার হয়নি, বরং আরও বেড়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে যুক্ত নয়। এটি একটি সংক্রামক ব্যাধি। যে ভাইরাস যার ওপর ভর করবে, সে-ই ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠবে।
সবাইকে জুলাই জাদুঘর পরিদর্শনের আহ্বান জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, দেশে অমানবিকভাবে আয়নাঘর তৈরি করা হয়েছিল। জাদুঘরে এর একটি ডামি রূপ দেখা যাবে, কিন্তু বাস্তব রূপ ছিল এর চেয়েও কঠিন। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতির দুঃখের ঘটনাগুলো এই জাদুঘরে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিশেষ একটি দেশকে খুশি করতে অনেক উপাদান সেখান থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। অনেক নির্যাতিত মানুষের স্মৃতিচিহ্ন ও ছবি জাদুঘর থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি দেলোয়ার হোসেন—যাঁর ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের বিষয়ে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আক্ষেপ করেছিলেন—তাঁর একটি স্মৃতিচিহ্নও গায়েব করা হয়েছে। ফেলানীর স্মৃতিচিহ্নও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এটি ভালো লক্ষণ নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ক্ষমতায় এসে সবাই ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তোলে, কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে সবাই ইতিহাস বিকৃতির নায়ক ছিল বলে তিনি দাবি করেন। এই অপকর্ম থেকে কেউ বেরোতে পারেনি। প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন। তিনি ঐক্যবদ্ধ থাকার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ঐক্যবদ্ধ না থাকলে শত্রুরা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে পারে। আলেমরা একে অপরের বিরুদ্ধে গালমন্দ করছেন, এর পেছনে তৃতীয় কোনো শক্তির হাত থাকতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। মদিনার আদলে এ দেশে রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি হবে, সে জন্য প্রস্তুত হতে হবে বলেও তিনি মত দেন।




