ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের সংঘাত, অনৈক্য ও বিভেদ নিরসনে কয়েকটি রাজনৈতিক দল তাদের ইশতেহারে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন (সত্য ও পুনঃসমঝোতা) কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও সেই প্রতিশ্রুতি এখনো অপরীক্ষিতই রয়ে গেছে। নির্বাচনের ছয় মাস পার হয়ে গেলেও এমন কোনো কমিশন গঠন করা হয়নি, এমনকি জাতীয় সংসদ কিংবা রাজনৈতিক অঙ্গনে এ বিষয়ে কোনো আলোচনাও চোখে পড়ছে না।

সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এ ধরনের কমিশন গঠনের অঙ্গীকার করে। বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের কথা বলেছে, অন্যদিকে এনসিপি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ‘সমন্বিত সর্বদলীয় সত্যানুসন্ধান ও বিভেদ নিরসন’ কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, সরকার গঠনের মাত্র ছয় মাস হয়েছে, সামনে যথেষ্ট সময় আছে। তবে তারা মনে করছে, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ তাদের অপরাধ স্বীকার না করে বরং হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে, ফলে এমন কমিশন গঠন বাস্তবসম্মত নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারও একসময় এমন কমিশনের কথা বলেছিল, কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে থাকা এসব প্রতিশ্রুতি এখন ‘কথার কথা’ হয়ে আছে। কেউ এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার, যা এখনো বহাল আছে। দলটির বহু নেতা-কর্মী আত্মগোপনে রয়েছেন, অনেকে দেশ ছেড়েছেন। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই সমাজে বিভাজন-বিভক্তি দিন দিন প্রকট হয়েছে। এ বাস্তবতায় হানাহানি বন্ধ করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতেই বিভিন্ন মহল থেকে মূলত ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের কথা বলা হচ্ছে।

প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় এ অঞ্চলের মানুষের ওপর ধর্ষণ, নির্যাতন, গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল, যাতে পাকিস্তানিদের সহযোগী হয়েছিল এ অঞ্চলেরই কিছু মানুষ। পরে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সরকারের শাসনামলে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অনেকে। ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে আবারও বড় ধরনের নির্যাতন, হত্যা, গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হন এ ভূখণ্ডের মানুষ।

ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন প্রসঙ্গে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ২০২৫ সালের মে মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করেছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ এবং তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তবে পরে বিষয়টি আর এগিয়ে নেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার। এর আগে ২০২৫ সালের ১০ মে বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর দ্বিতীয় খসড়ার ওপর এক মতবিনিময় সভায় কবি ও রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহার বলেছিলেন, যারা গুমের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিচার করতে গেলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থাকবে না। তিনি অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস কমিশনের মাধ্যমে সমাধানের কথা উল্লেখ করেন। ওই সভাতেই তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানান, সরকার ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ কমিশন গঠন করবে এবং জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার কথা বলেন।

বিষয়টি নিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন গঠনের বিষয়টি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে আছে, চিন্তাভাবনা করেই এটি রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে দলটি, ধীরে ধীরে এটাও বাস্তবায়ন হবে। সংসদে কেন এ বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনি সংসদ সদস্য নন, যাঁরা সংসদ সদস্য তাঁরা কেন বিষয়টি তোলেননি, সেটা তিনি বলতে পারেন না।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের দায়িত্ব পেলে জামায়াত ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে। এটা এমন একটি কাজ, যা সরকারে যাওয়া ছাড়া করা যায় না। সংসদে এ বিষয়ে আলোচনা না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেবল একটি সেশন হয়েছে, ধৈর্য ধরতে হবে।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, আওয়ামী লীগ এখনো চোরাগোপ্তা হামলা, হুমকি ও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে। ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন শুরুই হয় ভুল স্বীকার করার মধ্য দিয়ে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ভুল স্বীকার করতে হবে, এটাই প্রথম ধাপ। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সমর্থক গোষ্ঠী সমাজে আছে, তারা যদি রাজনৈতিকভাবে আবার আসতে চায়, তাহলে প্রথমে তাদের বলতে হবে—তারা ভুল স্বীকার করছে।

দেশে সহিংসতা চলতে থাকলে ও ক্ষোভ জমা থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে সমাজে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা তৈরি হয় বলে মন্তব্য করেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম হিংসা, বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা প্রবাহিত হয়। সত্য উদঘাটন করে সমঝোতার জায়গায় আসা দরকার, কিন্তু বিভিন্ন দলের এ বিষয়ে কথা বলা ‘কথার কথা’ হিসেবেই আছে। ঐতিহাসিক সব জখম নিরাময় না করলে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া মুশকিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

উল্লেখ্য, দীর্ঘ সংঘাতের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শান্তি প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক উত্তরণে সত্য উদঘাটন ও সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে এমন কমিশন করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৯৯৫ সালে জাতীয় ঐক্য উন্নয়ন ও পুনর্মিলনবিষয়ক আইনের আওতায় গঠিত হয় ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন (টিআরসি)। দেশটির টিআরসি বিশ্বের কাছে নতুন মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং পরে সিয়েরা লিওন, লাইবেরিয়া, কানাডা, আর্জেন্টিনা, চিলি, ঘানা, গুয়াতেমালা, পেরু, পূর্ব তিমুর, মরক্কোসহ অনেক দেশ এ মডেল অনুসরণ করে। বাংলাদেশে ২০০৮ সালে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ‘সত্য ও জবাবদিহি কমিশন’ (ট্রুথ কমিশন) গঠন করা হয়েছিল, তবে হাইকোর্টের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরই কমিশনটিকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়।