ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরের ত্রাণশিবিরগুলোতে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের মৃত্যু এবং প্রশাসনের উদাসীনতা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি গীতা মিত্তল কমিটির তথ্যের ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ প্রশ্ন তুলেছে যে, স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও রাজ্য সরকার কেন সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এই বিষয়ে বিস্তারিত হলফনামা দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মণিপুরের মুখ্য সচিবকে। আদালতের নির্দেশনায় অস্বাভাবিক মৃত্যুগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীদের আইনি শাস্তি এবং শিবিরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে। বিশেষ করে, ৩৪টি মৃত্যুর ঘটনার মধ্যে কেন মাত্র ২০টি দেহের ময়নাতদন্ত করা হলো, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছে শীর্ষ আদালত। এছাড়া, অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় মৃতদের পরিবারকে ২০ থেকে ৩০ হাজার রুপির মতো সামান্য ক্ষতিপূরণ দেওয়াকে রাজ্য প্রশাসনের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা হিসেবে অভিহিত করেছে আদালত।
মণিপুর আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা এই ৩৪টি মৃত্যুর মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করে সঠিক কারণ নির্ধারণে সহায়তা করে এবং বাকি কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করে। পাশাপাশি প্রতিটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় এফআইআর নিশ্চিত করতে এবং তদন্তের বর্তমান অবস্থা জানিয়ে আলাদা স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় রাজ্য প্রশাসনকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে আদালত। মামলার পরবর্তী শুনানি ২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর নির্ধারিত হয়েছে।
মামলার শুনানিতে রাজ্যের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ঐশ্বর্য ভাটি জানান, বিশেষ তদন্তকারী দলের (SIT) অধীনে ৩ হাজার ২০টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৮৩টি মামলায় প্রমাণের অভাবে ক্লোজার রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে, ৩০২টি মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে এবং ৩৮টিতে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্তমানে ১ হাজার ১৩৫টি মামলা তদন্তাধীন। অন্যদিকে, সিবিআই ৩১টি মামলার মধ্যে ২৮টিতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে এবং ৩টিতে ক্লোজার রিপোর্ট দিয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট এর আগে গুয়াহাটি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নির্দেশ দিয়েছিল যেন সিবিআই ও এনআইএ-র আদালতগুলো মণিপুরের মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়। তবে সিবিআই-এর আইনজীবী জানিয়েছেন, দুর্নীতি দমন আইনের মামলার চাপে সপ্তাহে মাত্র দুই দিন মণিপুরের শুনানি সম্ভব হচ্ছে। 이에 대해 প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, দক্ষ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সপ্তাহে দুই দিন কাজ করেও বিচারে গতি আনা সম্ভব। তবে চাপ কমাতে দুটি বিশেষ আদালত গঠনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মনিটরিং কমিটির সাবেক ডিজিপি পড়সালগিকরের ১৬তম স্থিতি প্রতিবেদনে রাজ্যের বর্তমান অস্থিরতার চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে এনআরসি হালনাগাদের দাবিতে সাধারণ ধর্মঘটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে ত্রাণশিবিরগুলোর মানবিক সংকট, যা বিচারপতি গীতা মিত্তল কমিটির ৪৭তম রিপোর্টে স্পষ্ট হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ৩৪টি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মধ্যে মাত্র ২৫টিতে এফআইআর করা হয়েছে এবং ২০টিতে ময়নাতদন্ত হয়েছে।
রাজ্য বিধানসভার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৩ মে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মোট ৩০৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন। মূলত মেইতেই জনগোষ্ঠীর তফসিলি উপজাতির মর্যাদার দাবিকে কেন্দ্র করে মেইতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়। চরম সংকটের মুখে ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং পদত্যাগ করলে রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি হয়। ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সেই শাসন প্রত্যাহার করে বিজেপি নেতা ওয়াই খেমচাঁদ সিংয়ের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়। নতুন নেতৃত্ব আসলেও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ এখনো দীর্ঘ ও জটিল।




