পারিবারিক অশান্তি, কর্মক্ষেত্রের চাপ কিংবা পরীক্ষার উৎকণ্ঠার মতো মানসিক অস্থিরতার কারণে অনেক সময় ত্বকে ব্রণের উপদ্রব বেড়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে 'স্ট্রেস অ্যাকনি' বা 'স্ট্রেস পিম্পল' বলা হয়। সাধারণত এই ধরনের ব্রণের ফলে মুখমণ্ডলে লালচে ভাব, ফোলাভাব এবং পুঁজযুক্ত ছোট দানা দেখা দেয়, যা পরবর্তীতে ত্বকে স্থায়ী দাগ বা ক্ষতের সৃষ্টি করতে পারে। অনেকে মনে করেন দামি কসমেটিকস বা ফেসওয়াশ ব্যবহার করলেই এই সমস্যা দ্রুত সমাধান হবে, তবে বিশেষজ্ঞরা একে ভুল ধারণা বলে অভিহিত করেছেন। মানসিক চাপের মূল কারণ দূর না করে কেবল বাহ্যিক যত্ন নিলে ত্বকের সংবেদনশীল স্তরটি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

নিউ ইয়র্কের আইকাহন স্কুল অফ মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ডা. অ্যাঞ্জেলা ল্যাম্ব জানান, সঠিক ক্লিনজার ব্যবহার এবং রক্তে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই এই সমস্যা দমন করা সম্ভব। অন্যদিকে, লস অ্যাঞ্জেলেসের সিডার্স-সিনাই মেডিকেল সেন্টারের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যালিসন কে. ট্রুং ব্যাখ্যা করেন যে, মানসিক চাপ সরাসরি ব্রণের জন্ম না দিলেও এটি বিদ্যমান ব্রণের প্রকোপ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র চাপের মুখে মস্তিষ্ক শরীরকে 'কর্টিসল' এবং 'অ্যান্ড্রোজেন' নামক হরমোন নিঃসরণের সংকেত দেয়। এই হরমোনগুলো ত্বকের তেলগ্রন্থিকে অতি-উদ্দীপিত করে, যার ফলে অতিরিক্ত সেবাম বা তেল উৎপন্ন হয়। এই তেল মৃত কোষের সঙ্গে মিশে ব্যাকটেরিয়ার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত স্ট্রেস পিম্পল হিসেবে প্রকাশিত হয়।

তবে মুখে ওঠা প্রতিটি ফুসকুড়িই যে মানসিক চাপের কারণে হয়, তা নয়। ডা. অ্যাঞ্জেলা ল্যাম্ব তিনটি ভিন্ন সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমটি হলো 'ফলিকুলাইটিস', যা লোমকূপের গোড়ায় ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাসের সংক্রমণের ফলে হয়। দ্বিতীয়টি 'অ্যালার্জিক কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস', যা কোনো রাসায়নিক বা নতুন প্রসাধনীর অতি-প্রতিক্রিয়ায় চুলকানির সঙ্গে লালচে র‍্যাশ হিসেবে দেখা দেয়। তৃতীয়টি হলো 'রোজাসিয়া', একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ যেখানে নাক ও গালে লালচে ভাব এবং ছোট ছোট ক্ষত তৈরি হয়।

এই সমস্যা সমাধানে বিশেষজ্ঞরা তিনটি চিকিৎসা পদ্ধতির কথা বলেছেন। সামান্য ব্রণের ক্ষেত্রে বেনজাইল পারক্সাইড, গ্লাইকোলিক অ্যাসিড বা স্যালিসিলিক অ্যাসিডযুক্ত মৃদু ক্লিনজার দিনে দুবার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মাঝারি ধরনের প্রদাহের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্লিন্ডামাইসিন, ড্যাপসোন বা অ্যাজেলাইক অ্যাসিড সমৃদ্ধ জেল ব্যবহার করা যেতে পারে। আর বন্ধ লোমকূপ পরিষ্কার ও কোষের পুনর্নবীকরণের জন্য রাতে ট্র্যাটিনয়েন ক্রিম বা ০.১ শতাংশ অ্যাডাপালিন জেল ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে, তবে এটি অবশ্যই বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে হতে হবে।

পরিশেষে, ডা. ল্যাম্ব সতর্ক করে বলেছেন যে, অভ্যন্তরীণ মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কোনো দামি ক্রিমই স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না। কর্টিসল হরমোন কমাতে প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট গভীর শ্বাসের ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মেডিটেশন এবং প্রতিদিন ১৫ মিনিট প্রকৃতির মাঝে হাঁটার অভ্যাস করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।