ফুসফুসের একটি মারাত্মক সংক্রমণ হলো নিউমোনিয়া, যা বিভিন্ন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া কিংবা জীবাণুর প্রভাবে হতে পারে। যদিও যেকোনো মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন, তবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এর ঝুঁকি এবং জটিলতার মাত্রা অনেক বেশি থাকে। মূলত রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে গেলে শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়, যার ফলে জীবাণুর আক্রমণ ঠেকানোর সক্ষমতা কমে যায়। এই কারণে সাধারণ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণও দ্রুত গুরুতর নিউমোনিয়ায় পরিণত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তে অনিয়ন্ত্রিত শর্করা শ্বেত রক্তকণিকার স্বাভাবিক কার্যকারিতাকে ব্যাহত করে এবং ফুসফুসের সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করে দেয়। বিশেষ করে যারা দীর্ঘকাল ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছেন, বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা যাদের কিডনি ও হৃদ্‌রোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে ডায়াবেটিস রোগীর রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে, যা শরীরকে পানিশূন্য করে তোলে এবং কিটো-অ্যাসিডোসিসের মতো জীবনঘাতী জটিলতা তৈরি করতে পারে।

এই রোগের কিছু সাধারণ লক্ষণ রয়েছে, যার প্রতি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জ্বর ও কাঁপুনি, কফসহ বা শুকনো কাশি, শ্বাসকষ্ট, শ্বাস নেওয়ার সময় বুকে ব্যথা, চরম অবসাদ, ক্ষুধামন্দা এবং অস্বাভাবিক আচরণ। তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া জরুরি। যেমন—যদি শ্বাস নিতে তীব্র কষ্ট হয়, ঠোঁট বা মুখ নীল হয়ে যায়, অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব বা বিভ্রান্তি দেখা দেয়, কিংবা রক্তে শর্করার মাত্রায় অস্বাভাবিক ওঠানামা ঘটে। বিশেষ করে বয়স্ক এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসার বিলম্ব মারাত্মক হতে পারে।

নিউমোনিয়ার চিকিৎসা মূলত সংক্রমণের কারণ এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, তবে ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর হয় না। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিউমোনিয়ার চিকিৎসার পাশাপাশি রক্তে শর্করার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ অপরিহার্য। অসুস্থতার সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ইনসুলিন বা ডায়াবেটিসের ওষুধ বন্ধ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

প্রতিরোধের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার সঠিক নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে কার্যকর উপায়। নিয়মিত পরীক্ষা, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং ওষুধের নিয়ম মেনে চলা জরুরি। এছাড়া নিউমোকক্কাল এবং ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণ এই রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং অসুস্থ ব্যক্তির থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা প্রয়োজন। ধূমপান ফুসফুসের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, তাই এটি বর্জন করা উচিত। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল খাবার এবং পুষ্টিকর খাদ্যের মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।