পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা উদ্যোগটি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে 'মক্কা প্রতিরক্ষা জোট' নামে পরিচিত হবে। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত তিন দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর এই নাম ঘোষণা করা হয়। গত সোমবার বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানান, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে জোটটির একটি স্থায়ী সচিবালয় স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। জোটের প্রথম মহাসচিব হিসেবে পাকিস্তান থেকে একজন নিয়োগ দেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জোটের মূল নীতিগুলোর মধ্যে রয়েছে—অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা। হাকান ফিদান বলেন, এই নীতির ভিত্তিতেই জোটটি গঠিত হয়েছে এবং অঞ্চলের যেকোনো দেশ চাইলে এতে অংশ নিতে পারবে।
এই বৈঠকের তাৎপর্য আরও বেড়েছে কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রায় এক মাস বিরতির পর নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এটি অনুষ্ঠিত হলো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সংঘাত ইতিমধ্যে ছয় মাস অতিক্রম করেছে। সম্প্রতি কিছুদিন শান্ত থাকার পর আবারও হামলার ঘটনা ঘটছে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার রোববার তুরস্কে পৌঁছান। ইসহাক দার লন্ডন থেকে সরাসরি সেখানে যান, এর আগে তিনি যুক্তরাজ্যে একটি আলাদা সফর সম্পন্ন করেন। সপ্তাহ খানেক আগে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে সোমবারের বৈঠকে মিসরও অংশ নিতে পারে। তবে প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে নয়; বরং ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতায় নিয়োজিত চার দেশের একটি হিসেবে মিসরের উপস্থিতি প্রত্যাশা করা হচ্ছিল। ওই চার দেশ দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সর্বশেষ গত ৫ আগস্ট জর্ডানের আম্মানে এবং তার আগে জুন মাসে কায়রোতে দেশগুলোর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই কায়রো বৈঠকেই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক সইয়ের বিষয়টিকে স্বাগত জানানো হয়েছিল।
তবে সোমবারের বৈঠকের মূল ফোকাস ছিল ৭ আগস্ট মক্কায় সই হওয়া ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি। এই চুক্তির আওতায় একটি কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা এখন চুক্তির রাজনৈতিক অঙ্গীকারগুলোকে বাস্তবায়নের উপযোগী কাঠামোতে রূপ দিতে কাজ করছে। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা চালানো হলে তা তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু জোটের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কীভাবে পরিচালিত হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে এই পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা কার্যকর হবে—সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি।
ইস্তাম্বুল বৈঠকে পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার, সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। তুরস্কের পক্ষ থেকে অংশ নেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলের এবং চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ সেলচুক বায়রাকতারওলু। সৌদি আরবের প্রতিনিধিদলে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান এবং চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ ফাইয়াদ আল-রুওয়াইলি।
বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে তিন দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ও যৌথ কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধি, যৌথ সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষাশিল্পে যৌথ উৎপাদন ও গবেষণা এবং সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে সমন্বয়ের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গত ৮ আগস্ট আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাকান ফিদান জানিয়েছিলেন, সৌদি আরবে জোটের স্থায়ী সচিবালয় থাকবে, তবে এর কাঠামো ও দায়িত্ব এখনও তিন সদস্য দেশের মধ্যে চূড়ান্ত হয়নি। অনেকেই এই জোটের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারাকে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সাথে তুলনা করছেন, কিন্তু স্বতন্ত্র বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটোর মতো এখানে কোনো সমন্বিত কমান্ড, স্থায়ী বাহিনী বা যৌথ সামরিক কাঠামো নেই।
ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার তুঘরাল ইয়ামিন আল-জাজিরাকে বলেন, চুক্তি কার্যকর করতে একটি দপ্তর বা সচিবালয় অপরিহার্য। তিনি বলেন, এই সচিবালয় যেকোনো দেশে অবস্থিত হতে পারে, আবার পালাক্রমে বিভিন্ন দেশেও গঠিত হতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি বেলজিয়ামে অবস্থিত ন্যাটোর সুপ্রিম হেডকোয়ার্টার্স অ্যালায়েড পাওয়ারস ইউরোপের উদাহরণ তুলে ধরেন।
কাতার ইউনিভার্সিটির গালফ স্টাডিজ সেন্টারের গবেষক সিনেম চেঙ্গিজ আল-জাজিরাকে বলেন, তুরস্কের পার্লামেন্টে চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য পাঠানোর আগে এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত চুক্তির পূর্ণ শর্তাবলি প্রকাশ করা হবে না বলেই মনে হচ্ছে।
চলতি বছর আসিম মুনিরের এটি ছিল চতুর্থ ইরান সফর। ২৪ আগস্ট তিনি তেহরানে গিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজায়ির সঙ্গে বৈঠক করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ বন্ধে দেশটির প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই সফর হয়েছিল। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানান, সফরে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক পুনরুজ্জীবিত করা এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
পেজেশকিয়ান এ সময় বলেন, ওয়াশিংটনকে তার ভাষা পরিবর্তন করতে হবে। তবে দুই দিন পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়ে দেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো তাড়াহুড়ো নেই। এরপর গত সকালে সেন্টকম হরমুজ প্রণালির লারাক দ্বীপে আইআরজিসির দুটি রকেট উৎক্ষেপণস্থলে হামলা চালায়। এক মাসের মধ্যে এটিই ছিল ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম স্বীকৃত হামলা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আইআরজিসি পাল্টা জবাব দেয় এবং দাবি করে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে জর্ডানের কিং হুসেইন ও আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে এবং ড্রোন দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। তবে জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের এই দাবি অস্বীকার করে।
তুঘরাল ইয়ামিনের মতে, প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় জোট যদি স্পষ্টভাবে ইরানবিরোধী জোটে পরিণত হয়, তাহলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা অংশীদার এবং তেহরানের বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী—এই দুই ভূমিকাতেই পাকিস্তানের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। ইস্তাম্বুলের ইবনে খালদুন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ গোকহান এরেলি বলেন, এই তিন দেশের সম্পর্ক যুদ্ধের কারণে তৈরি হয়নি, যুদ্ধ শুরুর আগেও তাদের মধ্যে সহযোগিতা ছিল। তিনি পাকিস্তান-সৌদি আরবের কয়েক দশকের নিরাপত্তা সম্পর্ক এবং কৌশলগত স্বনির্ভরতার জন্য তুরস্কের নিজস্ব প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন। এরেলির মতে, জোটের প্রকৃত পরীক্ষা হবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর। যদি যৌথ ব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিক সচিবালয় ও প্রতিরক্ষাশিল্পে যৌথ উদ্যোগ উত্তেজনার এই পর্ব শেষ হওয়ার পরেও টিকে থাকে, তাহলে বোঝা যাবে এই চুক্তি আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামোর মৌলিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে সিনেম চেঙ্গিজ এই চুক্তিকে কেবল 'প্রতীকী' বা 'বড় পরিবর্তন আনার মতো'—এই দুই বর্ণনার কোনোটির সঙ্গেই পুরোপুরি একমত নন।




