অশুভের বিনাশ আর শুভ শক্তির জয়ের প্রত্যয় নিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন মহাঅষ্টমী উদযাপিত হয়েছে। সোমবার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নিষ্ঠার সাথে দেবী দুর্গার বন্দনা করেন। ঢাকার বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কে অবস্থিত গুলশান-বনানী পূজা মণ্ডপে ভোর থেকেই ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে দেবী দুর্গার মহাষ্টম্যাদি কল্পারম্ভ ও বিশেষ পূজা সম্পন্ন হয়, যেখানে দেবীর চরণে ১০৮টি নীল পদ্ম অর্পণ করা হয়।

মহাঅষ্টমীর প্রধান আকর্ষণ ছিল পুষ্পাঞ্জলি প্রদান। সকাল ৭টা ৪০ থেকে ৭টা ৫৫ মিনিটের মধ্যবর্তী সময়ে শুদ্ধ বস্ত্রে এবং উপবাস থেকে ভক্তরা দেবী দুর্গার চরণে বেলপাতা ও পুষ্প অর্পণ করেন। এসময় পুরো মণ্ডপ এলাকা ঢাকের বাদ্যি, উলুধ্বনি এবং কাঁসর ঘণ্টার শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে। এরপর শুরু হয় বিশেষ ‘সন্ধিপূজা’, যার সময়সীমা ছিল সকাল ৭টা ৫৫ মিনিট থেকে ৮টা ৪৩ মিনিট পর্যন্ত। পুরোহিত সুনীল চক্রবর্তীর মতে, অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণের এই বিশেষ ৪৮ মিনিটে দেবী চামুণ্ডা রূপ ধারণ করে চণ্ড ও মুণ্ডকে বধ করেছিলেন। এই স্মৃতি স্মরণে ৬৪টি মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে পুরো দেবীবাস আলোকিত করা হয়। এছাড়া অন্ন, বস্ত্র ও দেবীর দশ হাতের দিব্য অস্ত্রের বিশেষ পূজা সম্পন্ন হয় বলে জানান পুরোহিত হৃদয় চক্রবর্তী।

সকাল ৯টায় সস্ত্রীক পূজা মণ্ডপে উপস্থিত হন ভারতীয় হাই কমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। সেখানে অঞ্জলি প্রদান করে তিনি জানান, তিনি এখানে কোনো কূটনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং পরিবারের সদস্য ও একজন ভক্ত হিসেবে এসেছেন। মণ্ডপের শিল্পকর্ম ও প্রতিমার কারুকার্যের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের শিল্পকলা অসামান্য, আর এই উৎসবগুলোই শিল্পীদের দক্ষতা প্রমাণের বড় সুযোগ করে দেয়। তিনি আরও বলেন, পূজায় অঞ্জলি দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো নিজের অহংকার বিসর্জন দেওয়া। তাঁর মতে, মানুষের ভেতরের হিংসাত্মক চিন্তা ও কুচিন্তাই হলো প্রকৃত ‘মহিষাসুর’, আর দৈনন্দিন জীবনে এই অশুভ প্রবৃত্তিকে দমন করাই হলো পূজার আসল শিক্ষা। তিনি প্রত্যাশা করেন, উৎসবের এই প্রীতি ও সম্প্রীতির পরিবেশ যেন প্রতিদিন বজায় থাকে।

গুলশান-বনানী সর্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক বিনয় গোপাল রায় জানান, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিভিন্ন ধাপে ভক্তরা অঞ্জলি প্রদান করেছেন এবং প্রসাদ বিতরণ করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, ভারতীয় হাই কমিশনারের পাশাপাশি সন্ধ্যায় ব্রিটিশ হাইকমিশনারের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। ভিড় থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় সবকিছু সুশৃঙ্খলভাবে চলছে।

হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতি শরতে দেবী দুর্গা সন্তানদের নিয়ে কৈলাস থেকে মর্ত্যে আসেন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করে পুনরায় ফিরে যান। শুক্রবার ষষ্ঠীর মাধ্যমে শুরু হওয়া এবারের উৎসবে সপ্তমীর তিথি দীর্ঘ হওয়ায় রবি ও সোমবার পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার নবমী এবং বুধবার বিজয়া দশমীর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গাপূজার সমাপ্তি ঘটবে। শাস্ত্রীয় বর্ণনা অনুযায়ী, এবার দেবী ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে এসেছেন এবং নৌকায় করে ফিরে যাবেন।