আমাদের দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের পাশাপাশি বসবাস করা এক সাধারণ দৃশ্য। অনেক সময় মুসলিম ও অমুসলিম প্রতিবেশীদের মাঝে ধর্মীয় পার্থক্যের কারণে সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দোদুল্যমানতা দেখা দেয়। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিবেশীর অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এক্ষেত্রে মুসলিম ও অমুসলিমের মাঝে কোনো মৌলিক ভেদাভেদ করা হয়নি। কোরআন ও হাদিসের আলোকে অমুসলিম প্রতিবেশীর সাথে একজন মুসলিমের আচরণ কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে পাঁচটি মূলনীতি আলোচনা করা হলো।

প্রথমত, সার্বজনীন মর্যাদা ও অধিকার প্রদান। ইসলামে প্রতিবেশীর মর্যাদা এতটাই উঁচুতে যে, ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে এই বিষয়ে বারবার তাগিদ দিয়েছিলেন। নবীজির বর্ণনা অনুযায়ী, জিবরাইল (আ.) প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে এত বেশি কথা বলছিলেন যে, তাঁর মনে হয়েছিল হয়তো প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারীর মর্যাদা দেওয়া হবে। ইসলামি আইনজ্ঞদের মতে, প্রতিবেশীর তিন ধরনের শ্রেণিবিভাগ রয়েছে। আত্মীয় মুসলিম প্রতিবেশীর তিনটি অধিকার, অনাত্মীয় মুসলিম প্রতিবেশীর দুটি এবং অমুসলিম প্রতিবেশীর অন্তত একটি মৌলিক অধিকার রয়েছে, যা হলো প্রতিবেশীর সাধারণ অধিকার।

দ্বিতীয়ত, মানবিক সম্প্রীতি ও সদাচরণ। পবিত্র কোরআনের সুরা নিসায় আল্লাহ তাআলা মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশীদের সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই আয়াতে উল্লিখিত 'দূর প্রতিবেশী' বলতে অমুসলিম প্রতিবেশীদের বোঝানো হয়েছে। ফলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সাথে উত্তম আচরণ করা একজন মুমিনের ধর্মীয় দায়িত্ব। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আমরের দৃষ্টান্ত এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য, যিনি বকরি জবাই করার পর তাঁর দাসকে বারবার জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, ইহুদি প্রতিবেশীর ভাগে মাংস দেওয়া হয়েছে কি না।

তৃতীয়ত, উপহার ও খাদ্যের ভাগাভাগি। পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধির জন্য উপহার বিনিময় ইসলামের একটি সুন্দর রীতি। অমুসলিম প্রতিবেশীর ঘরে ভালো খাবার পাঠানো বা উপহার দেওয়া সাহাবিদের সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। এটি সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করতে সাহায্য করে।

চতুর্থত, বিপদে পাশে থাকা ও সহানুভূতি। অমুসলিম প্রতিবেশীর অসুস্থতা বা সামাজিক সংকটে পাশে দাঁড়ানো ইসলামের অন্যতম শিষ্টাচার। এর একটি অনন্য উদাহরণ পাওয়া যায় মদিনায়, যেখানে একজন ইহুদি কিশোর নবীজিকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করত। ছেলেটি অসুস্থ হয়ে পড়লে নবীজি (সা.) তাঁর বাড়িতে গিয়ে মাথার কাছে বসে খোঁজখবর নিয়েছিলেন। ইমাম গাজালির মতে, কোনো অমুসলিম প্রতিবেশী আর্থিক বা সামাজিক সংকটে পড়লে একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো সবার আগে তাঁর পাশে দাঁড়ানো।

পঞ্চমত, নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা। ইসলামে কাউকে কষ্ট দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, বিশেষ করে প্রতিবেশীকে। নবীজি (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, যে ব্যক্তির অনিষ্ট বা ক্ষতি থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এই নির্দেশনায় প্রতিবেশীর ধর্মের কথা উল্লেখ করা হয়নি, অর্থাৎ মুসলিম হোক বা অমুসলিম, তাঁর জীবন, সম্পদ এবং সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একজন মুসলিমের ইমানি দায়িত্ব।

পরিশেষে, অমুসলিম প্রতিবেশীর সাথে মানবিক আচরণ কেবল সামাজিক সৌজন্য নয়, বরং ইসলামের মহানুভবতার বহিঃপ্রকাশ। সহমর্মিতা ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমেই সমাজে স্থায়ী শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখা সম্ভব।