শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাঅষ্টমী তিথিতে দেবী দুর্গার প্রতিরূপ হিসেবে কুমারী শিশুদের আরাধনা করেছেন বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের মূল শক্তি কুমারী শিশুদের মধ্যে বীজ আকারে বিদ্যমান থাকে। এই আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই অষ্টমীর দিনে কুমারী পূজার রীতি পালন করা হয়। মূলত মানববন্দনা, নারীর সম্মান রক্ষা এবং ঈশ্বরের আরাধনার শিক্ষাই এই পূজার মূল লক্ষ্য।
সোমবার সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার গোপীবাগে অবস্থিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে এই বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়। এখানে ৬ বছর বয়সী ইর্যা চক্রবর্তী 'উমা' নামে শাস্ত্রীয় উপাধিতে ভূষিত হয়ে দেবীর আসনে উপবিষ্ট ছিলেন। পূজা শেষে তিনি সকলের মঙ্গলের জন্য আশীর্বাদ করেন। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ পূর্ণাত্মানন্দ মহারাজ জানান, শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব তাঁর স্ত্রী সারদা দেবীকে মাতৃজ্ঞানে পূজা করেছিলেন, যার ধারাবাহিকতায় এই প্রথা চলে আসছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, স্বামী বিবেকানন্দ বেলুর মঠে প্রথম দুর্গাপূজার সময় নয়জন কুমারীর পূজা করেছিলেন। বিবেকানন্দের এই পূজার বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল যে, তিনি কেবল ব্রাহ্মণ কন্যাই নয়, বরং অব্রাহ্মণ এবং এমনকি অ-হিন্দু কুমারীদেরও আদ্যাশক্তি হিসেবে পূজা করেছিলেন। এই প্রথাটি কেবল ঢাকায় নয়, বরং সারাদেশের সকল রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে পালিত হয়েছে।
একই দিনে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে সন্ধিপূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। ১০৮টি প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে শুরু হয় এই বিশেষ পূজা, যেখানে দেবীর চরণে ১০৮টি বেলপাতা এবং ১০৮টি পদ্মফুল নিবেদন করা হয়। ঢাকের বাদ্যি, কাঁসর-ঘণ্টার আওয়াজ ও মন্ত্রোচ্চারণে মুখরিত হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। মহানগর কেন্দ্রীয় পূজা মণ্ডপের পুরোহিত বরুণ চক্রবর্তী জানান, অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমীর শুরুর ২৪ মিনিট মিলিয়ে মোট ৪৮ মিনিটের এই বিশেষ সময়ে সন্ধিপূজা অনুষ্ঠিত হয়। পঞ্জিকার নির্ধারিত লগ্নে এই পূজা সম্পন্ন করা হয়, যার মূল উদ্দেশ্য হলো অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির জয় নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, প্রদীপের আলোর মাধ্যমে মানুষের জীবন অন্ধকার থেকে মুক্তি পেয়ে আলোকিত হোক এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক—এই প্রার্থনাই করা হয়।
এই সংবেদনশীল পূজার প্রস্তুতি সম্পর্কে মহানগর সর্বজন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ জানান, অত্যন্ত সীমিত সময়ের কারণে পূর্বপ্রস্তুতি নিতে হয়। বিশেষ করে পদ্মফুলের পাপড়ি যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং প্রদীপের শিখা যেন স্থির থাকে, সেদিকে কঠোর নজর রাখা হয়। এজন্য মণ্ডপে ফ্যান বন্ধ রাখা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া নবমী উপলক্ষে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ ডেক মহাপ্রসাদ বিতরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার উদ্বোধন করবেন ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
ধর্মীয় বিশ্বাস মতে, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তি বিনাশ করে শান্তি স্থাপনের জন্য প্রতি শরতে কৈলাস থেকে মর্ত্যে আসেন। মহালয়ার দিনে দেবীপক্ষের সূচনা হয়ে ষষ্ঠীর বোধনের মাধ্যমে পূজা শুরু হয় এবং দশমীর বিসর্জনের মাধ্যমে এর সমাপ্তি ঘটে। এরপর কোজাগরী পূর্ণিমার লক্ষ্মীপূজায় দেবীপক্ষের সমাপ্তি হয়। ত্রেতাযুগে ভগবান রামের অকালবোধনের মাধ্যমে দেবী দুর্গার আরাধনার কথা উল্লেখ করা হয়, যার ফলে এই উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। তবে শাস্ত্র অনুযায়ী দেবীর প্রকৃত আগমনের সময় বসন্তকাল, যাকে বাসন্তী পূজা বলা হয়। চলতি বছরের শাস্ত্রীয় গণনা অনুযায়ী, দেবীর আগমন ঘোড়ায় (ঘোটক) এবং গমন নৌকায়, যা যথাক্রমে অস্থিতিশীলতা এবং শুভ সংকেত বা শস্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।




